আত্মবিশ্বাসের ব্যবসা: রতন টাটার অনুপ্রেরণার গল্প
আত্মবিশ্বাসের ব্যবসা: রতন টাটার অনুপ্রেরণার গল্প
-
মোঃ জয়নাল আবেদীন
১৯৩৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর, ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই শহরে এক নামী পরিবারে জন্ম নিল এক ছোট্ট শিশু — রতন নাভাল টাটা। চারপাশে ঐশ্বর্য, প্রভাব আর সম্ভ্রান্ত বংশের পরিচয়; কিন্তু এই শিশুর জীবনের সূচনা সহজ ছিল না।
রতনের বাবা নাভাল টাটা ছিলেন টাটা পরিবারের একজন সৎ ও কর্মঠ সদস্য, আর মা সোনু টাটা ছিলেন মার্জিত ও স্নেহময়ী। কিন্তু ভাগ্যের খেলা — রতন যখন মাত্র দশ বছরের, তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেই সময় ভারতের সমাজে এটি ছিল এক বিরল ও বেদনাদায়ক ঘটনা। ছোট্ট রতন নিজের মনে এক বিশাল আঘাত অনুভব করলেন, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
তাঁর দায়িত্ব নিলেন দাদী লেডি নবজীবন টাটা, যিনি ছিলেন অদম্য মনোবল ও নীতির প্রতীক। তিনি ছোট রতনকে বলেছিলেন,
“রতন, মানুষের মর্যাদা জন্মে নয়, আচরণে। কখনো অহঙ্কার করো না, কারণ বিনয়ই বড়ত্বের চিহ্ন।”
এই কথাটি রতনের মনে গেঁথে গেল।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন চুপচাপ, লাজুক, কিন্তু গভীর চিন্তাশীল। খেলাধুলার চেয়ে বই পড়া, যন্ত্রপাতি খোলা-জোড়া লাগানো— এই কাজগুলোই তাঁকে বেশি টানত। স্কুলে তাঁর সহপাঠীরা যখন হৈচৈ করত, রতন তখন জানালার ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত, “মানুষ কেন অন্য মানুষের প্রতি অন্যায় করে?”
তিনি একবার তাঁর শিক্ষককে বলেছিলেন, “আমার মনে হয়, সফল মানুষ মানে সেই, যে কাউকে কষ্ট না দিয়ে কিছু গড়ে।”
এই ছোট্ট বালকটি তখনও জানত না — একদিন তাঁর নাম হয়ে উঠবে ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত উদ্যোক্তাদের একজনের নাম।
দাদীর কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন মানবিকতা ও নম্রতার শিক্ষা, আর পরিবার থেকে পেয়েছিলেন পরিশ্রম ও সততার ঐতিহ্য। এই দুই শক্তিই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
রতনের শৈশবের দিনগুলো কেটেছিল ক্যাম্পিয়ন স্কুল ও ক্যাথেড্রাল অ্যান্ড জন কনন স্কুল, মুম্বাইয়ে। তিনি ছিলেন একজন মনোযোগী ছাত্র, তবে কখনো নিজেকে বড় পরিবারের সন্তান হিসেবে আলাদা ভাবেননি। সাধারণ পোশাক, সাধারণ খাবার— কিন্তু অসাধারণ চিন্তা।
তাঁর দাদী প্রায়ই বলতেন,“রতন, মনে রেখো — তোমার হাতে যদি ক্ষমতা আসে, সেটি মানুষের মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করবে, নিজের অহংকারের জন্য নয়।”
এই উপদেশই তাঁর জীবনের পথনির্দেশ হয়ে থাকে চিরদিন।
শৈশবের এই সরল, সৎ, এবং মানবিক শিক্ষা থেকেই জন্ম নেয় রতনের ভেতরের আত্মবিশ্বাসের ব্যবসায়ী— যিনি পরবর্তীতে কোটি মানুষের জীবনে আলো ছড়ান।
১৯৫৫ সাল। বয়স তখন মাত্র আঠারো। রতন টাটা স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে নতুন এক যাত্রার পথে পা বাড়ালেন — বিদেশে উচ্চশিক্ষা। তাঁর গন্তব্য আমেরিকার করনেল বিশ্ববিদ্যালয়।
বিদায়ের দিন দাদী লেডি নবজীবন তাঁকে বলেছিলেন,“রতন, মনে রেখো — বিদেশে তুমি টাটার নাতি নও, একজন সাধারণ ছাত্র।
নিজের সম্মান অর্জন করতে হবে নিজের কর্মে।”
এই বাক্যই তাঁর জীবনের প্রথম দিশা হয়ে গেল।
বিদেশের মাটিতে পৌঁছে রতন টাটা প্রথমবারের মতো একাকীত্ব অনুভব করলেন। সেখানে কেউ তাঁকে চিনত না, কেউ তাঁর পদবি জানত না। তিনি বুঝলেন, এখন তাঁকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
তিনি ভর্তি হলেন Architecture এবং Structural Engineering বিষয়ে। দিনে ক্লাস, রাতে নকশা আঁকা— নিঃশব্দ এক সংগ্রাম। কখনো কখনো তিনি নিজের খাবার নিজে রান্না করতেন, বাসন মাজতেন, বরফে ঢাকা রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন।
একবার তাঁর এক সহপাঠী জিজ্ঞেস করল,
— “তুমি টাটা পরিবারের ছেলে, তাহলে এত কষ্ট করছ কেন?”
রতন মৃদু হেসে বললেন,“কারণ কষ্ট ছাড়া শেখা যায় না। জীবন কাউকে ছাড় দেয় না, যতই বড় পরিবারে জন্ম হোক।”
করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং শিখলেন না — শিখলেন সৃজনশীলভাবে ভাবতে।
তিনি বুঝলেন, ব্যবসা মানে শুধু মুনাফা নয়; এটি হলো মানুষের প্রয়োজন মেটানোর শিল্প।
তাঁর নকশায় ছিল বাস্তবতার ছোঁয়া, আর মননে ছিল নীতির দৃঢ়তা। শিক্ষকেরা তাঁকে বলতেন, “তুমি অন্যদের মতো নও, তোমার চিন্তায় মানবিকতা আছে।”
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময় তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজে কাজ করবেন। তিনি ছোট একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ নিলেন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে। সেখানে তিনি নিজ হাতে ইট তুলেছেন, নকশা পরিমাপ করেছেন, মাঠে ঘাম ঝরিয়েছেন।
তিনি অনুভব করলেন, “আসল নেতৃত্ব শুরু হয় নিচ থেকে। মানুষকে বুঝতে হলে, তার সঙ্গে কাজ করতে হয়।”
এই সময়েই তাঁর চরিত্রে গড়ে ওঠে বিনয়, আত্মনির্ভরতা, আর বাস্তব চিন্তা— যা তাঁকে আজীবন সফল রাখবে।
১৯৬২ সালে তিনি করনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন পড়েন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে, ম্যানেজমেন্ট কোর্সে। সেখানে তিনি বুঝলেন — প্রযুক্তি ও মানবসম্পর্কের মেলবন্ধনই ব্যবসার আসল শক্তি।
বিদেশের প্রাপ্ত শিক্ষা তাঁকে শিখিয়েছিল এক অনন্য সত্য: “যে নিজেকে শাসন করতে পারে, সে-ই অন্যকে নেতৃত্ব দিতে পারে।”
এই শিক্ষা নিয়ে রতন টাটা ফিরে এলেন ভারতে — তাঁর নিজের মাটিতে, নিজের মানুষের জন্য কাজ করতে। তিনি তখনও জানতেন না, তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল দায়িত্ব — টাটা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব।
১৯৬২ সাল। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে তরুণ রতন টাটা ফিরে এলেন নিজের মাটিতে— ভারতে।
সবাই ভেবেছিল, টাটা পরিবারের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই অফিসের বড় চেয়ারেই বসবেন। কিন্তু রতন নিজের জন্য বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ।
তিনি যোগ দিলেন টাটা স্টিল কোম্পানিতে, জাঁকজমকপূর্ণ অফিসে নয়— সরাসরি জমশেদপুরের কারখানায়। সেখানে তিনি কাজ করতেন সাধারণ কর্মচারীদের সঙ্গে, কখনো ধুলো-মাটি মেখে, কখনো গরম ধাতু গলানোর চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে।
শ্রমিকেরা অবাক হয়ে বলতেন, “এই লোকটা টাটার ছেলে? তাহলে আমাদের মতো পরিশ্রম করছে কেন?”
রতন হেসে বলতেন, “আমি টাটার নামের নয়, নিজের কাজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে এসেছি।”
এই বিনয়ী কথাগুলো শুনে অনেকেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করত।
দিনের পর দিন তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে থেকে বুঝলেন— একটি কোম্পানির আসল শক্তি অফিসে নয়, কারখানায়; নেতৃত্ব মানে শুধু আদেশ দেওয়া নয়, বরং সহযোগিতা করা ও বোঝা।
তিনি শিখলেন, কিভাবে মেশিনের আওয়াজের ভেতরেও মানুষের পরিশ্রমের গল্প লুকিয়ে থাকে।
তিনি শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্যার কথা শুনতেন, কারো অসুস্থ স্ত্রী বা সন্তানের খবর রাখতেন।
এই মানবিক সম্পর্কই তাঁকে অন্যরকম নেতা বানিয়ে তুলেছিল।
টাটা গ্রুপের তখনকার কর্তা ছিলেন জে.আর.ডি. টাটা, যিনি রতনের কাজ দেখে মুগ্ধ হন।
রতন ধীরে ধীরে ছোট ছোট প্রকল্পের দায়িত্ব পেতে শুরু করলেন — টাটা মোটরসের ট্রাক উৎপাদন, টাটা চা-এর ব্যবসা, এমনকি টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (TCS)-এর প্রাথমিক পরিকল্পনাতেও যুক্ত ছিলেন।
তিনি সব জায়গাতেই একটিই দর্শন অনুসরণ করতেন— “কোনো কাজ ছোট নয়, আর কোনো কর্মচারী তুচ্ছ নয়।”
তবু তাঁর পথ সহজ ছিল না। কোম্পানির অনেক সিনিয়র সদস্য তাঁকে অবজ্ঞা করতেন। কেউ বলত, “ও তো শুধু পরিবারের ছেলে, কী বুঝবে ব্যবসা?”
কিন্তু রতন কখনো জবাব দিতেন না। তাঁর নীরবতা ছিল জ্ঞানের প্রতীক, আর কাজ ছিল তাঁর উত্তর।
তিনি জানতেন — আত্মবিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
বছরের পর বছর পরিশ্রমের পর ১৯৯১ সালে, জে.আর.ডি. টাটা অবসর নিলেন এবং তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে রতন টাটার নাম ঘোষণা করলেন।
সেদিন তিনি বলেছিলেন,“রতন কখনো নিজেকে আমার উত্তরাধিকারী ভাবেনি; সে নিজেকে টাটার কর্মী মনে করেছে।
এই বিনয়ই তাকে নেতা বানিয়েছে।”
এইভাবে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায় — রতন টাটার নেতৃত্বে টাটা গ্রুপের নবজাগরণ।
রতন টাটা তখন বলেন,“আমার জীবনের প্রথম ৩০ বছর আমাকে শিখিয়েছে — নেতৃত্ব জন্মগত নয়, এটি তৈরি হয় ঘাম, শ্রম, আর সততায়।”
এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে গড়ে তুলেছিল এমন এক মানুষে, যিনি শুধু ব্যবসা বোঝেন না, মানুষ ও মানবিকতা বোঝেন।
১৯৯১ সাল। ভারতের অর্থনীতি তখন এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে — বৈদেশিক ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি, আর সরকারি নীতির পরিবর্তনে দেশজুড়ে অস্থিরতা। ঠিক সেই সময়েই রতন টাটা দায়িত্ব নিলেন টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে।
অনেকে সন্দেহের চোখে তাকিয়েছিল — “সে কি পারবে এত বড় সাম্রাজ্য সামলাতে?”
কিন্তু রতনের চোখে ভয় ছিল না। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা — “আমরা কেবল কোম্পানি চালাতে আসিনি, আমরা ভারতকে এগিয়ে নিতে এসেছি।”
টাটা গ্রুপ তখন বিশাল এক সংস্থা — প্রায় ৯০টির বেশি কোম্পানি, যার অনেকগুলোই একে অপরের সঙ্গে সমন্বয়হীন। পুরনো ধারায় পরিচালিত এসব ব্যবসা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছিল। রতন বুঝলেন, পরিবর্তন না আনলে পতন অনিবার্য।
তিনি সাহস করে বললেন,“আমাদের নতুন প্রজন্মের চিন্তা দরকার, পুরনো সাফল্যের ভরসা নয়।”
এই কথায় অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছিল, কিন্তু তিনি দৃঢ় থেকে গেলেন।
তিনি শুরু করলেন সংগঠনের পুনর্গঠন।
প্রতিটি কোম্পানিকে একত্রে নিয়ে আসলেন “Tata Sons”-এর অধীনে।
তিনি বললেন, “আমরা আলাদা আলাদা নদী নই, আমরা একসাথে প্রবাহিত সাগর।”
এরপর তিনি টাটার জন্য তৈরি করলেন এক নতুন দৃষ্টি — “Leadership with Trust” (বিশ্বাসভিত্তিক নেতৃত্ব)। এই মূলমন্ত্রেই টাটা ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে ভারতের গর্ব।
রতন টাটা বুঝতেন, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির হাতে।
তিনি তরুণ প্রকৌশলীদের উৎসাহিত করলেন, নতুন আইডিয়া বাস্তবায়নের সুযোগ দিলেন।
এই সময়েই টাটা মোটরস, টাটা টেলিসার্ভিসেস ও টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (TCS) নিজেদের আধুনিক রূপে গড়ে তুলতে শুরু করল।
অনেক প্রবীণ কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন। কেউ বললেন, “এই তরুণদের হাতে কোম্পানি ধ্বংস হবে।”
রতন শান্তভাবে জবাব দিলেন,“যদি আমরা আজ পরিবর্তন না করি, কাল ইতিহাস আমাদের বদলে দেবে।”
পরিবর্তনের সময় ভুল ও ব্যর্থতাও আসতে লাগল। কিছু প্রকল্প বন্ধ করতে হলো, কিছু বন্ধুত্ব হারালেন।
তবুও তিনি থামলেন না।
তিনি জানতেন — নেতৃত্ব মানে সবার মন জয় নয়, বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, যদিও তা জনপ্রিয় না হয়।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস।
তিনি বলতেন, “আমি ভয় পাই না ব্যর্থতাকে, কারণ ব্যর্থতা ছাড়া সাফল্যের রাস্তা নেই।”
১৯৯৮ সালে টাটা গ্রুপ নতুন যুগে প্রবেশ করল।
টাটা মোটরস তৈরি করল ভারতের প্রথম দেশীয় যাত্রীবাহী গাড়ি — Tata Indica। অনেকে বলেছিল, “এটা চলবে না।” কিন্তু রতন বললেন,“আমরা অন্যের নকল করব না, নিজেদের তৈরি করব।”
এটাই ছিল ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির প্রতি আত্মবিশ্বাসের শুরু।
৯০-এর দশক শেষে টাটা গ্রুপ ধীরে ধীরে নতুন রূপে উঠে আসছে।
রতন টাটা প্রমাণ করলেন, পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন স্বপ্ন তৈরি করা যায়, যদি নেতৃত্বে থাকে সাহস ও সততা।
তিনি বলেছিলেন এক অবিস্মরণীয় কথা —“যখন সবাই সন্দেহ করে, তখনই সময় নিজের উপর বিশ্বাস রাখার।”এই বিশ্বাসই ছিল তাঁর ব্যবসার প্রকৃত মূলধন।
ন্যানো প্রকল্পের পর, রতন টাটা যখন ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য গাড়ি বানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন, তখন তাঁর দৃষ্টি চলে গেল বিশ্বের দিকে।
তাঁর মনে একটাই স্বপ্ন ঘুরছিল—
“ভারতও পারে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের মালিক হতে। ভারতীয় শিল্পের নাম যেন গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ হয়।”
একদিন টাটা সন্স-এর বোর্ড মিটিংয়ে রতন টাটা বললেন, “আমরা শুধু ভারতে গাড়ি বানাতে পারব না, আমাদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বে নিয়ে যেতে হবে।”
তখনকার দিনে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে,
এক ভারতীয় কোম্পানি একদিন কিনে নেবে ব্রিটিশ লাক্সারি ব্র্যান্ড— Jaguar ও Land Rover (JLR)।
অনেকে বলল, “স্যার, ওগুলো আমাদের সাধ্যের বাইরে। ওগুলো ব্রিটিশ রাজকীয় গাড়ি!”
রতন হেসে উত্তর দিলেন, “অসম্ভব? একদিন ব্রিটিশরা ভারতে শাসন করেছে, আজ ভারতই ব্রিটিশদের সম্পদ কিনবে।”
২০০৮ সালের মার্চ মাস।
বিশ্ব অর্থনীতি তখন মন্দার কবলে, সবাই ভয় পাচ্ছে বিনিয়োগ করতে। ঠিক সেই সময় রতন টাটা ঘোষণা দিলেন— “Tata Motors অধিগ্রহণ করছে Jaguar ও Land Rover।”
চুক্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বমঞ্চ স্তব্ধ হয়ে গেল।
আমেরিকা ও ইউরোপের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হলো— “An Indian Company Buys The Pride of Britain!”
একজন সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনি ভয় পাননি?”
রতন টাটা শান্তভাবে বললেন, “আমি ভয় পাইনি, কারণ আমি বিশ্বাস করেছি আমাদের কর্মীদের ওপর।”
JLR তখন প্রায় ধ্বংসের পথে ছিল— বিক্রি কমে গেছে, লোকসান বাড়ছে।
অনেকে ভাবল, টাটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কিন্তু রতন টাটা দিনরাত কাজ করলেন,
কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনলেন,
নতুন প্রযুক্তি ও ডিজাইন উন্নয়নে উৎসাহ দিলেন।
মাত্র দুই বছরের মধ্যে চিত্র বদলে গেল।
২০১০ সালের মধ্যে Jaguar ও Land Rover ফের লাভে ফিরল। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল—
এক ভারতীয় মালিকের নেতৃত্বে, ব্রিটিশ ব্র্যান্ডগুলো পুনর্জীবিত হলো।
এই সাফল্যের পর, রতন টাটা শুধু এক ব্যবসায়ী নয়,
ভারতের এক প্রতীক হয়ে উঠলেন।
বিশ্বের মঞ্চে ভারতীয় শিল্পের নাম জ্বলজ্বল করতে লাগল।
অনেক বিদেশি সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কীভাবে এত বড় অর্জন সম্ভব করলেন?”
তিনি হেসে বললেন, “আমি কেবল স্বপ্ন দেখেছি, আর বিশ্বাস করেছি ভারতের শক্তিতে।”
এই বিশাল অর্জনের পরও রতন টাটার জীবন রইল সহজ, নিরহংকার। তিনি বিলাসবহুল গাড়িতে নয়, সাধারণ টাটা সেডানে চলতেন। নিজের হাতে চা বানিয়ে অতিথিদের খাওয়াতেন।
যে কর্মী ক্লান্ত থাকত, তাকে বলতেন, “চলো, একটু চা খাই, তারপর আবার চেষ্টা করি।”
তিনি সবসময় মনে করতেন— “আমার প্রকৃত সম্পদ হলো আমার কর্মীরা, আমার মানুষ।”
রতন টাটা প্রমাণ করেছেন,
একটি দেশের সাফল্য শুধু প্রযুক্তি বা অর্থে নয়, দৃষ্টিভঙ্গি ও সততার ওপর নির্ভর করে।
তিনি ভারতকে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিলেন,
যেখানে “Made in India” লেখা মানে গর্ব।
“সাফল্য মানে শুধু টাকা নয়;
সাফল্য মানে এমন কিছু করা,
যাতে তোমার দেশের মাথা উঁচু হয়।” — রতন টাটা
২০১২ সাল। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর রতন টাটা টাটা সন্স-এর চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর নিলেন।
কিন্তু তাঁর জীবন থেমে গেল না—বরং শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়, যেখানে তিনি আর ব্যবসায়ী নন, বরং মানবতার দূত।
অবসরের পর প্রথম দিন অফিসে না গিয়ে তিনি গেলেন গ্রামীণ স্কুলে। ছোট ছোট বাচ্চারা তাঁকে ঘিরে ধরল, কেউ চিনত, কেউ না। রতন টাটা মুচকি হেসে বললেন,“আমি আর চেয়ারম্যান নই, এখন তোমাদের বন্ধু।”
এই সরল বাক্যে যেন প্রকাশ পেল তাঁর জীবনদর্শন—
সাফল্য মানে নয় ক্ষমতা, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
রতন টাটা শুরু থেকেই জানতেন— সমাজে যারা দুর্বল, তাদের পাশে না দাঁড়ালে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।
তাই তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন Tata Trusts-এর মাধ্যমে।
এই সংস্থা ভারতের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও দরিদ্র মানুষের কল্যাণে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
তাঁর তত্ত্বাবধানে শুরু হয়—
-
গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন,
-
মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি,
-
পরিষ্কার পানীয় জলের প্রকল্প,
-
এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ক্ষুদ্র ঋণ সহযোগিতা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, “দান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা কাউকে নির্ভরশীল নয়, আত্মনির্ভর হতে শেখায়।”
একবার এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“স্যার, আপনি এত দান করেন, অথচ নিজের নামে কোনো ফাউন্ডেশন রাখেননি কেন?”
রতন টাটা শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
“দান কখনো প্রচারের বিষয় নয়, এটি দায়িত্বের বিষয়।”
এই কথাই তাঁর নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি—
তিনি চেয়েছেন নিঃস্বার্থভাবে সমাজকে ফিরিয়ে দিতে।
রতন টাটা সবসময় তরুণদের বলতেন,“তুমি যদি দ্রুত যেতে চাও, একা যাও; কিন্তু যদি দূর যেতে চাও, সবাইকে নিয়ে যাও।”
তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে সেসব তরুণ, যারা সততা ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।
অসংখ্য স্টার্টআপে তিনি বিনিয়োগ করেন, যেমন—
Ola, Paytm, Zivame, UrbanClap, CureFit—
শুধু মুনাফার জন্য নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে উত্সাহ দেওয়ার জন্য।
অত্যন্ত ধনী হয়েও রতন টাটার জীবন ছিল আশ্চর্যভাবে সাধারণ। তিনি একা থাকতেন, বিলাসবহুল বাড়ি নয়, বরং এক ছোট অ্যাপার্টমেন্টে।
নিজের হাতে চা বানিয়ে অফিসে যেতেন, কারও সাফল্যে ঈর্ষা নয়—
সবসময় বলতেন,“নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলো না;
বরং প্রতিদিন নিজের গতকালের চেয়ে ভালো হও।”
রতন টাটা শুধু ব্যবসায় নয়,
তিনি হয়ে উঠেছেন আত্মবিশ্বাস, সততা ও মানবতার প্রতীক।
তাঁর জীবন শেখায়—“যদি তুমি হৃদয় থেকে ভালো কিছু করো, তার প্রতিদান একদিন না একদিন তোমার কাছে ফিরে আসবেই।”
রতন টাটা শিখিয়েছেন— ব্যবসার আসল শক্তি টাকা নয়, আত্মবিশ্বাস ও সততা। যিনি নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখেন, তিনিই ইতিহাস লেখেন।
রতন টাটার জীবন একটাই বার্তা দেয়— “যদি তোমার মন সৎ হয়, আর কাজের প্রতি বিশ্বাস থাকে, তবে পৃথিবী তোমার পথ থামাতে পারবে না।”