স্টিভ জবসের বিখ্যাত ভাষণ: “Stay Hungry, Stay Foolish”

30 Oct 2025 11:28:34 AM

 স্টিভ জবসের বিখ্যাত ভাষণ: “Stay Hungry, Stay Foolish”

সময়: ১২ জুন, ২০০৫
স্থান: স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি

বক্তা: স্টিভ জবস, Apple ও Pixar-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা

সংগ্রহে- মোঃ জয়নাল আবেদীন 

 


 

সূর্য উজ্জ্বল, বাতাসে হালকা উষ্ণতা।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মাঠে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও অতিথি বসে আছে সাদা টুপি ও লাল পোশাকে সজ্জিত এক বিশাল সমুদ্রের মতো। সেই ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক সরল, কালো পোশাকের মানুষ— স্টিভ জবস।

তাঁর মুখে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি, কিন্তু চোখে গভীর চিন্তার ছায়া।তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলেন…
পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল মাইক্রোফোনে শোনা গেল তাঁর ধীর কণ্ঠস্বর—

“আজ আমি তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি এমন একজন হিসেবে… যে কখনও কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়নি।”

এক মুহূর্তে সবাই চমকে উঠল।
কারণ, স্ট্যানফোর্ডের মতো মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে কেউ এমন কথা খুব কমই বলে।

স্টিভ একটু হেসে যোগ করলেন— “সত্যি বলতে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের অভিজ্ঞতা কোনো কলেজ গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানের।”

সেই হাসির মধ্যেই ছিল জীবনের গভীর শিক্ষা—
একজন মানুষ, যাকে একসময় কেউই বিশ্বাস করত না, আজ সেই মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, আর বলছেন— “আমি কখনো ডিগ্রি পাইনি।”

তিনি মাইক্রোফোনের কাছে এগিয়ে এসে বললেন— “আমি তোমাদের তিনটি গল্প বলতে চাই।
কোনো বড় দর্শন নয়, কেবল তিনটি গল্প— আমার জীবনের।”

পুরো মাঠ নিঃশব্দ। তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে এক অদ্ভুত আগ্রহ। স্টিভের কণ্ঠে তখন দৃঢ়তা ও মায়া—
একজন মানুষ তাঁর হৃদয়ের দরজা খুলে দিচ্ছেন পৃথিবীর সামনে।

তিনি বললেন— “প্রথম গল্পটি হলো ‘বিন্দুগুলো একদিন যুক্ত হয়।’”



 গল্প ১: বিন্দুগুলো একদিন যুক্ত হয়

(Connecting the Dots)

১৯৭২ সাল। এক তরুণ কলেজের প্রথম বর্ষে ভর্তি হলো। তার নাম— স্টিভ জবস।
সে অতি কৌতূহলী, চঞ্চল, কিন্তু নিয়মের বাঁধনে একদমই স্বস্তি পায় না। কলেজের পাঠ্যবই তার কাছে বিরক্তিকর, কারণ তার ভেতরের কণ্ঠ বলছিল—

“আমি যা শিখছি, এর কোনো মানে আমার জীবনে থাকবে না।”

তার বাবা-মা তাদের সঞ্চয় ভেঙে কলেজের ফি দিচ্ছিলেন। কিন্তু স্টিভের মনে হচ্ছিল, তিনি তাদের কষ্টের মূল্য দিচ্ছেন না।
অবশেষে একদিন সাহস করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন — “আমি কলেজ ছাড়ব।”

সবাই অবাক, অনেকে বলল — “তুমি ভবিষ্যত নষ্ট করে ফেলছ!”
কিন্তু স্টিভ বললেন,

“আমি ভয় পাইনি। কারণ আমি বিশ্বাস করেছিলাম — যদি আমি আমার হৃদয়ের কথা শুনি, জীবন আমাকে ভুল পথে নিতে পারে না।”

 

 কলিগ্রাফির জগতে প্রবেশ

কলেজ ছাড়লেও তিনি কলেজের ক্যাম্পাস ছেড়ে যাননি।
যেসব ক্লাস তার আগ্রহ জাগাত, সেগুলোয় তিনি চুপিচুপি বসতেন।
একদিন তিনি ঢুকে পড়লেন একটি কলিগ্রাফি ক্লাসে — যেখানে শেখানো হয় সুন্দর হাতের লেখা, অক্ষরের নকশা, টাইপফেসের শিল্প।

ক্লাসটি তার মনে গভীর ছাপ ফেলল।
তিনি মুগ্ধ হয়ে দেখতেন কীভাবে এক একটি অক্ষরকে শৈল্পিকভাবে আঁকা যায় —
কীভাবে “A” বা “B” কেবল বর্ণ নয়, এক একটি শিল্পকর্ম হয়ে উঠতে পারে।

তখন তার বয়স মাত্র কুড়ি।
তিনি জানতেন না, এই জিনিস তার জীবনে কোনো কাজে লাগবে কিনা।
কিন্তু তিনি শিখলেন — কারণ তার মন বলছিল শিখো, যুক্তি বলছিল “না”, কিন্তু হৃদয় বলছিল “হ্যাঁ!”

 

দশ বছর পরে: Apple জন্ম নিল

বছর দশেক পর, যখন স্টিভ জবস ও তার বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াক তাদের গ্যারেজে বসে প্রথম Apple Computer বানাচ্ছিলেন, তখন সেই কলিগ্রাফি ক্লাসে শেখা শিল্পবোধ ফিরে এল।

তারা ঠিক করলেন—
“আমাদের কম্পিউটার কেবল যন্ত্র হবে না, এটি হবে সুন্দর।”

তখনকার অন্য সব কম্পিউটারে শুধু একরকম ফন্ট ছিল, কিন্তু Macintosh (Apple-এর প্রথম সফল কম্পিউটার) এ ছিল একাধিক আকর্ষণীয় ফন্ট, নকশা, টাইপফেস।

এটাই Apple-কে অন্যদের থেকে আলাদা করল।
এটাই মানুষের হৃদয় জয় করল।

স্টিভ বললেন—

“আমি যদি কলেজ না ছাড়তাম, তাহলে সেই কলিগ্রাফি ক্লাসে যেতাম না।
আর যদি সেই ক্লাসে না যেতাম, তাহলে Apple কখনো সুন্দর ফন্ট তৈরি করত না।”

 

 বিন্দুগুলোর জাদু

তারপর তিনি থেমে গেলেন, হাসলেন, আর বললেন—

“তুমি এখন বসে বসে ভবিষ্যতের বিন্দুগুলো যুক্ত করতে পারবে না।
তুমি কেবল অতীতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারবে— সবকিছুই আসলে যুক্ত ছিল।”

তার মানে কী?
আজকের কষ্ট, বিভ্রান্তি বা ছোট্ট সিদ্ধান্ত— এখন অর্থহীন মনে হলেও ভবিষ্যতে একদিন বুঝবে, এগুলোই তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেবে, যেখানে তোমার থাকা উচিত।

তিনি বললেন—

“তুমি বিশ্বাস রাখো — কিছু একটা তোমাকে পথ দেখাবে।
হয় তা তোমার বিশ্বাস, ভাগ্য, অন্তর, বা জীবন নিজেই।
এই বিশ্বাসই আমাকে কখনো হতাশ হতে দেয়নি।”

 

 গল্পের শিক্ষা:

  1. জীবনে এখন যা ঘটছে তা অর্থহীন মনে হলেও, একদিন তারই অর্থ প্রকাশ পাবে।

  2. নিজের হৃদয়ের কথা শুনো। সমাজের সব নিয়মই ঠিক নয়, কিছু নিয়ম ভাঙতে হয় নিজের পথ খুঁজে পেতে।

  3. বিশ্বাস রাখো জীবনের ওপর। একদিন সব বিন্দু মিলেই তোমার সাফল্যের ছবি আঁকবে।

 


 

 গল্প ২: ভালোবাসা ও হারানো

(Love and Loss)

১৯৭৬ সাল।
স্টিভ জবস তখন মাত্র ২১ বছরের তরুণ। গ্যারেজে বসে তিনি ও তার বন্ধু স্টিভ ওজনিয়াক মিলে একটি ছোট কোম্পানি শুরু করলেন— নাম Apple।
তারা জানতেন না, এই ছোট্ট স্বপ্ন একদিন বিশ্বকে বদলে দেবে।

প্রথম দিকে কাজ ছিল কঠিন, অর্থ ছিল না, কিন্তু তাদের ছিল একটাই শক্তি— ভালোবাসা।
স্টিভ ভালোবাসতেন তার কাজকে, তার তৈরি প্রতিটি যন্ত্রে তিনি নিজের আত্মা ঢেলে দিতেন।
তিনি বলেছিলেন—

“আমি যেটা ভালোবাসতাম, সেটাই করতাম। আর সেটাই আমাকে শক্তি দিত।”

তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে Apple ক্রমে বেড়ে উঠল।
৩০ বছর বয়সে তিনি হয়ে উঠলেন বহুমূল্য কোম্পানির সিইও।
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না।

 

 নিজ কোম্পানি থেকে বহিষ্কার

একদিন বোর্ড মিটিংয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো।
স্টিভের সৃজনশীল চিন্তা ও কোম্পানির কিছু কর্মকর্তার ব্যবসায়িক চিন্তা মিলছিল না।
অবশেষে— যেটি কেউ ভাবতে পারেনি, সেটিই ঘটল।

স্টিভ জবসকে তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি, Apple থেকে বের করে দেওয়া হলো।
তিনি বলেছিলেন —

“আমি তখন ৩০ বছর বয়সে, আর হঠাৎই আমি বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হলাম।
আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক সময়।”

ভাবুন, যে মানুষ নিজের হাতে একটি স্বপ্ন গড়ে তুলেছিল, হঠাৎ একদিন সেই স্বপ্ন থেকেই তাকে বের করে দেওয়া হলো!

তিনি কয়েক সপ্তাহ কিছুই করতে পারেননি। তিনি রাস্তায় হাঁটতেন, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। মনে হতো, সব শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু কিছু সময় পর তিনি বুঝলেন —

“আমি আমার ভালোবাসার কাজ হারাইনি, শুধু আমার কাজের জায়গা হারিয়েছি।”

 

 নতুন শুরু: NeXT ও Pixar

স্টিভ নতুন করে শুরু করলেন।
তিনি নিজের কোম্পানি NeXT প্রতিষ্ঠা করলেন — আরও উন্নত কম্পিউটার তৈরির জন্য।
এরপর আরেকটি কোম্পানি কিনলেন, নাম Pixar — যেখানে তৈরি হলো বিশ্বের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র Toy Story।

এই সময়ই তার জীবনের মোড় ঘুরে গেল।
তিনি বলেছিলেন—

“Apple থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা।
কারণ ভার হালকা হয়ে গেল, আবার একজন শিক্ষানবিশের মতো নতুনভাবে শুরু করতে পারলাম।”

এই দুই কোম্পানি পরবর্তীতে এত সফল হলো যে Apple নিজেই NeXT কিনে নেয়।
আর এর ফলে স্টিভ জবস আবার Apple-এ ফিরে আসেন, এবার আরও শক্তিশালী, আরও পরিণত রূপে।

 

 ফিরে এসে নবজাগরণ

তিনি বলেছিলেন—

“জীবনে কখনো কখনো তোমার মাথায় ইটের মতো আঘাত লাগে।
কিন্তু বিশ্বাস হারিও না।”

Apple-এ ফিরে এসে তিনি তৈরি করেন সেই সব জিনিস, যা আজ বিশ্বকে বদলে দিয়েছে —
  iMac, iPod, iPhone, iPad...
প্রতিটি উদ্ভাবনই প্রমাণ করেছে— ভালোবাসা কখনো মরে না।

স্টিভ বলেছিলেন—

“আমি যেটা ভালোবাসতাম, সেটাই আমাকে টিকিয়ে রেখেছিল।
তুমি যদি তোমার কাজকে ভালোবাসো না, তুমি কখনো মহান কিছু করতে পারবে না।”

 

গল্পের শিক্ষা:

  1. হারানোই শেষ নয়। কখনো কখনো হারানোই নতুন সূচনা।

  2. ভালোবাসার কাজ করো। কারণ সেটাই তোমাকে কঠিন সময়ে বাঁচিয়ে রাখবে।

  3. বিশ্বাস রাখো। জীবন যদি সবকিছু কেড়ে নেয়, তবুও আবার ফিরিয়ে দেয় — যদি তুমি লড়াই চালিয়ে যাও।

 


 

 গল্প ৩: মৃত্যু সামনে রেখে জীবনযাপন

(Living Each Day as If It Were Your Last day)

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেই দিনটিতে, হাজারো তরুণ শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে স্টিভ জবস নীরব কণ্ঠে বললেন —

“আজ আমি তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি বলতে চাই — মৃত্যু।”

তিনি একটু থামলেন, তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,

“আমি প্রতিদিন সকালে আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি—
‘যদি আজ আমার জীবনের শেষ দিন হয়, তাহলে কি আমি আজকের কাজটা করতে চাই?’
আর যখনই বহুদিন ধরে উত্তর ‘না’ হয়, আমি বুঝি কিছু পরিবর্তন দরকার।”

 

 জীবনের অমূল্যতা বোঝা

স্টিভ বললেন —

“মৃত্যুর কথা মনে রাখা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
কারণ প্রায় সবকিছু — ভয়, লজ্জা, ব্যর্থতার আশঙ্কা — মৃত্যুর সামনে তুচ্ছ।”

তিনি জানতেন, সময় সীমিত।
আমরা সবাই ভাবি সময় অনেক আছে, কিন্তু সত্য হলো— সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না।

 

 ক্যান্সারের ভয়ঙ্কর খবর

২০০৩ সালের এক সকালে ডাক্তার আমাকে বললেন—

“আপনার অগ্ন্যাশয়ে একটি টিউমার পাওয়া গেছে।”

স্টিভ স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
মনে হলো জীবন হঠাৎ থেমে গেছে।
ডাক্তাররা বললেন, এটি সম্ভবত অচিকিৎসাযোগ্য ক্যান্সার।

সেই রাতে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি বসে ভাবলেন—

“হয়তো এটাই আমার জীবনের শেষ দিন।”

পরের দিন যখন তিনি অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ডাক্তাররা আবার পরীক্ষা করলেন।
তারা জানালেন— আশ্চর্যভাবে, এটি এক ধরনের নিরাময়যোগ্য টিউমার।
অস্ত্রোপচার সফল হলো, এবং তিনি আবার বেঁচে উঠলেন।

 

 মৃত্যুর কাছ থেকে শেখা

এই ঘটনার পর স্টিভ জবস বুঝলেন, মৃত্যু আসলে এক শিক্ষক।
তিনি বলেছিলেন —

“কেউ মরতে চায় না, এমনকি যারা স্বর্গে যেতে চায় তারাও না।
কিন্তু মৃত্যুই সেই গন্তব্য যেখানে আমরা সবাই একদিন পৌঁছাব।
মৃত্যুই জীবনের সেরা আবিষ্কার —
কারণ এটি পুরনোকে সরিয়ে নতুনের জায়গা তৈরি করে।”

তিনি তরুণদের উদ্দেশে বলেছিলেন —

“তোমাদের সময় সীমিত, তাই অন্যের জীবনের অনুকরণে সময় নষ্ট করো না।
অন্যের মতামতের শব্দে নিজের অন্তরের কণ্ঠকে হারাতে দিও না।”

 

 গল্পের শিক্ষা:

  1. মৃত্যুর কথা মনে রাখো, কারণ এটি তোমাকে জীবনের আসল মূল্য শেখাবে।

  2. প্রতিদিন বাঁচো এমনভাবে, যেন আজই শেষ দিন — তাহলে তুমি আর কোনো মুহূর্ত নষ্ট করবে না।

  3. অন্যের স্বপ্ন নয়, নিজের স্বপ্ন বেছে নাও।

 


 

 শেষ কথা: Stay Hungry, Stay Foolish

(তৃষ্ণার্ত থেকো, বোকা থেকো)

গ্রীষ্মের এক উজ্জ্বল সকাল। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মাঠে বসে আছে হাজারো তরুণ-তরুণী।
তাদের চোখে স্বপ্ন, মনে ভবিষ্যতের উদ্বেগ।
ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চে উঠলেন স্টিভ জবস— সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, এবং মুখে সেই পরিচিত শান্ত হাসি।

তিনি তিনটি গল্প বলেছিলেন, আর শেষে বললেন—

“আমি আমার ভাষণ শেষ করতে চাই একটি ছোট গল্প দিয়ে,
যা আমার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে আমাকে দিকনির্দেশ দিয়েছে।”

 

 একটি পুরনো বইয়ের গল্প

স্টিভ বললেন—

“যখন আমি তরুণ ছিলাম, তখন আমি একটি অসাধারণ বই পড়েছিলাম—
The Whole Earth Catalog.
এটি ছিল যেন ইন্টারনেটের আগের যুগের গুগল।
এতে লেখা থাকত— নতুন চিন্তা, প্রযুক্তি, ধারণা, জীবনদর্শন।”

বইটির শেষ পৃষ্ঠায় একটি ছবি ছিল—
একটি গ্রামীণ পথ, যার পাশে লেখা ছিল কেবল দুটি শব্দ—

‘Stay Hungry, Stay Foolish.’

স্টিভ বললেন, “এই দুটি শব্দ আমার হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।
আমি তখনও বুঝিনি এর গভীর অর্থ, কিন্তু জীবন আমাকে ধীরে ধীরে তা শিখিয়ে দিয়েছে।”

 

 ‘Stay Hungry’ — তৃষ্ণার্ত থেকো

স্টিভ বললেন —

“তৃষ্ণার্ত থেকো মানে হলো সবসময় নতুন কিছু জানার, শেখার, করার ক্ষুধা ধরে রাখা।
আমি যখন অ্যাপল শুরু করি, তখন কিছুই জানতাম না ব্যবসা সম্পর্কে।
কিন্তু আমি শিখতে চেয়েছিলাম। আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম নতুন কিছু তৈরি করতে।”

তিনি থেমে মৃদু হেসে বললেন —

“যখন মানুষ বলে ‘অসম্ভব’, তখনই তোমাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকতে হবে।”

 

 ‘Stay Foolish’ — বোকা থেকো

তারপর তিনি বললেন—

“বোকা থেকো মানে হলো ভয়ের বাইরে গিয়ে স্বপ্ন দেখা।
মানুষ তোমাকে বোকা বলবে যখন তুমি নতুন কিছু করতে চাও।
কিন্তু ইতিহাসের সব পরিবর্তন এনেছে সেই ‘বোকা’ মানুষগুলোই।”

তিনি স্মিতহাস্যে বললেন—

“যদি আমি বুদ্ধিমানদের কথা শুনতাম, তবে কখনোই গ্যারেজ থেকে শুরু করে অ্যাপল তৈরি হতো না।”

 

 একটি নীরব বার্তা

ভাষণের শেষে তিনি থামলেন, চারপাশে তাকালেন।
তার চোখে যেন এক অনন্ত আলোর ঝিলিক— জীবনের পরিপূর্ণতা, সত্য, আর তৃপ্তি।
তিনি বললেন,

“আজ আমি এই শব্দগুলো তোমাদের উপহার দিচ্ছি।
আমি আশা করি তোমরাও তৃষ্ণার্ত থাকবে, কৌতূহলী থাকবে, স্বপ্ন দেখতে ভয় পাবে না।”

তার কণ্ঠে তখন শান্ত দৃঢ়তা—

“Stay Hungry, Stay Foolish.”

অডিটরিয়ামে এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা, তারপর বজ্রধ্বনির মতো করতালি।
হাজার তরুণের চোখে অশ্রু, মুখে হাসি, মনে অনুপ্রেরণা—
একজন মানুষ তাদের শিখিয়ে গেলেন, কীভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেখা আর স্বপ্ন দেখা থামাতে নেই।

 

 গল্পের শিক্ষা:

  1. তৃষ্ণার্ত থেকো — কারণ শেখার ক্ষুধা তোমাকে জীবিত রাখে।

  2. বোকা থেকো — কারণ সাহসীরা ‘অসম্ভব’-কে ‘সম্ভব’ বানায়।

  3. স্বপ্ন দেখো, ভুল করো, আবার শিখো — এটাই জীবনের আসল সৌন্দর্য।

  4. কখনো ভেবে নিও না তুমি শেষ হয়ে গেছো, কারণ প্রতিটি ভোরই নতুন সুযোগ।