পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র: কোপারনিকাসের সংগ্রামের কাহিনি
পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র: কোপারনিকাসের সংগ্রামের কাহিনি
-
মোঃ জয়নাল আবেদীন
১৪৭৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, পোল্যান্ডের শান্ত শহর টোরুন। ভিস্তুলা নদীর তীরে তুষারে ঢাকা ঘরবাড়ির মাঝখানে সেদিন ভোরে জন্ম নিল এক শিশু—
নিকোলাস কোপারনিকাস।
শীতের সকালে আকাশ ছিল কুয়াশায় ঢাকা, কিন্তু এই শিশুর চোখে ছিল এক অদ্ভুত আলো—
যেন জন্মের দিন থেকেই সে জানত, আকাশের রহস্য একদিন তার হাতেই খুলবে।
কোপারনিকাসের বাবা ছিলেন নিকোলাস সিনিয়র, একজন সৎ ব্যবসায়ী;
আর মা বারবারা ওয়াটজেনরোড, ছিলেন শিক্ষিত ও ধর্মপরায়ণ এক নারী।
তাদের সংসার ছিল সাধারণ, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা।
ছোটবেলা থেকেই কোপারনিকাস ছিল নীরব, চিন্তাশীল, আর প্রশ্নে ভরা।
রাতের আকাশে ঝলমলে তারাগুলো তাকে যেন আহ্বান করত।
বয়স তখন মাত্র সাত-আট, তবুও অন্য বাচ্চাদের মতো সে খেলাধুলায় মেতে উঠত না।
প্রতিদিন রাত হলে সে চুপচাপ ঘরের জানালা খুলে বসে থাকত।
তার মা ডাক দিতেন,“নিকোলাস, ঘুমোতে যাও বাবা, ঠান্ডা লেগে যাবে।”
ছেলেটি উত্তর দিত, “মা, ওই তারা আজ ওইদিকে গেল কেন? চাঁদ কেন ছোট হয়ে যাচ্ছে?”
মা হেসে বলতেন,“ঈশ্বর যেমন চান, তেমনই ওরা চলে।” কিন্তু নিকোলাসের মনে প্রশ্নটা থেকে যেত—
“যদি ঈশ্বর চান, তবে কি এই নড়াচড়া শুধুই পৃথিবীর চারপাশে?”
সেই ছোট বয়সেই তার চোখে জন্ম নিল কৌতূহল—
“আকাশ কি সত্যিই যেমন সবাই বলে, তেমনই?”
যখন কোপারনিকাসের বয়স দশ বছর, তখন তার জীবনে এল গভীর শোক।
তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন (১৪৮৩)।
বাবার মৃত্যুর পর তার শৈশবের নিশ্চিন্ত পৃথিবী ভেঙে পড়ল।
রাতে জানালার ধারে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
“বাবা কি ওই তারার ওপারে চলে গেলেন?”
মৃত্যুর ছায়া তাকে ভয় পাইয়ে দেয়নি, বরং জীবনের প্রশ্নগুলোকে করেছে আরও গভীর।
সে আরও আগ্রহী হলো— আকাশের রহস্য বুঝতে, ঈশ্বরের নিয়ম খুঁজে পেতে।
বাবার মৃত্যুর পর, তার মামা লুকাশ ওয়াটজেনরোড—
যিনি ছিলেন একজন ধর্মযাজক ও শিক্ষিত মানুষ—
তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেলেন ফ্রমবর্ক শহরে।
সেখানেই নিকোলাসের জীবনে শুরু হলো জ্ঞানের প্রথম অধ্যায়।
মামার লাইব্রেরিতে ছিল অসংখ্য পুরোনো বই—
গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি।
ছোট্ট কোপারনিকাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই বইয়ের পাতায় হারিয়ে যেত।
একদিন সে খুঁজে পেল টলেমির পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের মানচিত্র—
যেখানে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলোকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে দেখা গেছে।
সে মন দিয়ে তা দেখল, আর নিজের মনে বলল,
“সবকিছু যদি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে, তবে সূর্য প্রতিদিন এত নিয়ম করে ওঠে কীভাবে?”
সেই প্রথম তার মনে জন্ম নিল এক বিপ্লবী ভাবনা—
“হয়তো সত্যটা উল্টো।”
১৪৮৫ সালের গ্রীষ্মে, টোরুনের আকাশে দেখা গেল এক বিরল ধূমকেতু।
পুরো শহর আতঙ্কে কেঁপে উঠল।
সবাই বলল, “এটি ঈশ্বরের ক্রোধের বার্তা!”
কিন্তু ১২ বছর বয়সী নিকোলাসের চোখে ছিল অন্য আলো।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এটা ভয় নয়, বিস্ময়ের চিহ্ন। আকাশ আমাদের কিছু বলতে চায়।”
সেই রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল—
একদিন সে বুঝবেই, আকাশ কীভাবে চলে, সূর্য ও পৃথিবীর আসল রহস্য কী।
বাবার মৃত্যুর পর যে শূন্যতা নিকোলাস কোপারনিকাসের জীবনে নেমে এসেছিল,
তার মামা লুকাশ ওয়াটজেনরোড তা পূরণ করার চেষ্টা করলেন।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন— এই শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক তীব্র অনুসন্ধিৎসা,
যে শুধু পড়তে নয়, বোঝতে চায় পৃথিবীকে।
১৪৮৬ সালে, বয়স তখন মাত্র তেরো।
নিকোলাসকে পাঠানো হলো পোল্যান্ডের অন্যতম প্রাচীন ও জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান—
ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এখানেই শুরু তার “জ্ঞানের অভিযাত্রা”।
বিরাট ভবনের মাঝে, খোলা প্রাঙ্গণে যখন সে প্রথম ক্লাসে বসে,
তার চোখ চকচক করছিল নতুন আশায়।
প্রথমবার সে শিখল গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, আর চার্চের শাস্ত্র।
তার শিক্ষক আলবার্ট ব্রুডজেভস্কি, বলেছিলেন,
“যে আকাশে তাকায়, সে একদিন পৃথিবীকেও বুঝে ফেলে।”
নিকোলাস মুগ্ধ হয়ে শুনত।
দিনে ক্লাস, রাতে ছাদের উপর বসে আকাশ পর্যবেক্ষণ করত।
ছোট্ট দূরবীন না থাকলেও, তার চোখে ছিল একধরনের বৈজ্ঞানিক তীক্ষ্ণতা।
সে গ্রহগুলোর গতিবিধি লিখে রাখত নিজের খাতায়—
“আজ চাঁদ একটু আগে উঠল”, “সূর্য পশ্চিমে ঢলছে অন্য কোণে।”
বন্ধুরা বলত,“তুমি তো সবসময় আকাশের দাস!”
সে হাসত, “না, আমি আকাশের ছাত্র।”
দিনের পর দিন, বছর পেরিয়ে,
তার মধ্যে জন্ম নিল গভীর প্রশ্ন—
“যদি পৃথিবী স্থির থাকে, তাহলে সূর্য প্রতিদিন নতুনভাবে উঠবে কেন?”
টলেমির পৃথিবী-কেন্দ্রিক তত্ত্ব তার মনে সন্দেহ জাগায়।
সে বইয়ের পাতায় উত্তর না পেয়ে তাকায় আকাশের দিকে—
যেখানে সূর্যের আলোয় প্রতিদিন নতুন এক ইঙ্গিত জ্বলে ওঠে।
একবার সে লিখেছিল বন্ধুকে চিঠিতে— “আমি মনে করি, সত্য এমন কিছু যা আমরা চোখে দেখি না, কিন্তু আকাশ প্রতিদিন তার দিকে ইঙ্গিত দেয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে, তার জ্ঞানপিপাসা থামল না।
সে চাইল বৃহত্তর পৃথিবীকে জানতে।
১৪৯৬ সালে, ২৩ বছর বয়সে, কোপারনিকাস রওনা হলেন ইতালির পথে—
রেনেসাঁ যুগের আলোয় ভরা এক দেশ,
যেখানে জ্ঞান, শিল্প আর চিন্তার নবজাগরণ ঘটছিল।
তিনি ভর্তি হলেন বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সেখানে তিনি পড়লেন ধর্মতত্ত্ব ও আইনের পাশাপাশি জ্যোতির্বিদ্যা।
রাতে শহরের ছাদে উঠে ইতালির স্বচ্ছ আকাশে তারার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতেন।
তার সহপাঠী ও বন্ধুরা বলত,
“তুমি কেন ঈশ্বরের বইয়ের বদলে আকাশের বই পড়ছো?”
কোপারনিকাস মৃদু হেসে বলতেন,
“দুটোই ঈশ্বরের বই— শুধু একটিতে লেখা আছে শব্দে, আর অন্যটিতে তারায়।”
এক রাতে, ১৪৯৭ সালের বসন্তে, বোলোগনার আকাশ ছিল নির্মল ও তারাভরা।
নিকোলাস টের পেলেন, সূর্যের চারপাশে ঘুরছে গ্রহগুলো—
যেন এক বিশাল অদৃশ্য সুরের নৃত্য চলছে।
সে মাটিতে বসে খাতায় গোল গোল বৃত্ত এঁকে বলল নিজেকে,
“না, পৃথিবী নয়... সূর্যই কেন্দ্র।”
এই উপলব্ধিটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠল মানব ইতিহাসের এক বৈপ্লবিক মোড়।
কিন্তু তখন সে জানত না— এই চিন্তা তাকে একদিন
চার্চের রোষ, অপমান, আর নিঃসঙ্গতার মুখে দাঁড় করাবে।
১৪৯৯ সালে কোপারনিকাস ইতালিতে তার পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এলেন পোল্যান্ডে।
তখন তার চোখে ছিল দৃঢ়তা, মনে প্রশ্ন, আর আত্মায় এক অদ্ভুত শান্তি।
সে বুঝেছিল—
সত্যের পথে হাঁটতে ভয় লাগে, কিন্তু ভয়ই মানুষকে অন্ধ করে।
তার এই জ্ঞানযাত্রা ছিল শুধু শিক্ষার নয়,
এক নবযুগের বীজ বপনের সূচনা।
১৫০০ সাল।
ইউরোপ তখন পরিবর্তনের পথে— নতুন দেশ আবিষ্কৃত হচ্ছে, নতুন চিন্তা জেগে উঠছে।
আর এই সময়েই তরুণ নিকোলাস কোপারনিকাস, ইতালিতে পড়াশোনা শেষ করে,
ফিরলেন নিজের দেশ পোল্যান্ডে।
কিন্তু তিনি ফিরলেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে।
যে ছেলেটি একসময় আকাশে তাকিয়ে বিস্মিত হত,
এখন সে জানে— সেখানে লুকিয়ে আছে এক মহাসত্য,
যা মানুষের হাজার বছরের বিশ্বাসকে বদলে দেবে।
ফ্রমবর্ক শহরের এক পুরোনো ক্যাথেড্রাল ভবনে
তিনি যোগ দিলেন ধর্মীয় প্রশাসক হিসেবে।
দেখতে ধর্মযাজকের পোশাক, কিন্তু মনে জ্বলছে গবেষণার আগুন।
দিনে তিনি চার্চের হিসাব-নিকাশ করেন,
আর রাতে টাওয়ারের ছাদে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তার হাতে কোনো আধুনিক যন্ত্র ছিল না।
ছিল শুধু কলম, খাতা, আর এক অদম্য কৌতূহল।
প্রতিদিন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়,
তিনি লিখে রাখতেন— “আজ সূর্য একটু তাড়াতাড়ি উঠল”, “গ্রহটি আজ একটু ভিন্ন কোণে।”
লোকেরা হাসত, বলত,
“এই পুরোহিত আবার জ্যোতির্বিদ হয়ে গেল নাকি?”
কিন্তু কোপারনিকাস জানতেন— হাসির নিচেই লুকিয়ে থাকে অজ্ঞতার ভয়।
বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ, হিসাব আর নির্ঘুম রাতের পর
অবশেষে এক গভীর উপলব্ধি তার মনে দৃঢ় হলো—
“যদি সূর্যকে কেন্দ্র ধরা হয়, সব কক্ষপথ, সব গতিবিধি, সব হিসাব মিলে যায় নিখুঁতভাবে।”
এই নতুন ধারণা ছিল বিপ্লবী।
কারণ, সেই যুগে সবাই বিশ্বাস করত—
পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র, আর সূর্য ও গ্রহগুলো ঘুরছে তার চারপাশে।
কোপারনিকাস সেই বিশ্বাসকে উল্টে দিলেন নিঃশব্দে।
তিনি জানতেন, এটা বলা মানে চার্চের রোষানলে পড়া,
তবু নিজের ডায়েরিতে লিখলেন—
“আমি দেখেছি সত্য। পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র।”
সেই একই বছরে তিনি গোপনে একটি ছোট পাণ্ডুলিপি লেখেন—
“Commentariolus” (অর্থাৎ ‘ছোট ব্যাখ্যা’)।
এ বইটি তিনি ছাপাননি, কেবল কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে পাঠালেন।
বইয়ে তিনি সাতটি সাহসী প্রস্তাব রাখলেন—
যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই কথাটি:
“পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে, এবং নিজের অক্ষের ওপরেও ঘূর্ণায়মান।”
এই এক বাক্য— মানুষের পৃথিবী-দর্শনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ভিতর থেকে।
কোপারনিকাস জানতেন, এই মতবাদ প্রকাশ করা মানে বিপদ ডেকে আনা।
কারণ চার্চ ঘোষণা করেছিল—
“যে বলবে পৃথিবী নড়ে, সে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে।”
তাই তিনি চুপ থাকলেন।
দিনে চার্চে প্রার্থনা, রাতে টাওয়ারের ছাদে গণনা।
প্রতিটি গ্রহের অবস্থান তিনি খাতায় লিপিবদ্ধ করতেন বছরের পর বছর।
বন্ধুরা বলত,
“আপনার গবেষণার ফল প্রকাশ করুন!”
তিনি মৃদু হেসে বলতেন,
“সময় এখনও আসেনি। সত্যকে কখনও তাড়াহুড়ো করে বলা যায় না।”
এই দীর্ঘ সময়ের নিঃসঙ্গতা তাকে কষ্ট দিত, কিন্তু সে কষ্টেই জন্ম নিচ্ছিল বিপ্লবের বীজ।
আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবতেন,
“যদি আমি চুপ থাকি, তবে অন্ধকারই রাজত্ব করবে।”
১৫৩০ সালের দিকে তার নোটবুকে জেগে উঠল এক বিশাল পরিকল্পনা—
একটি বই, যেখানে তিনি বিশ্বকে জানাবেন প্রকৃত সত্য।
তিনি লিখলেন প্রথম খসড়া, যেখানে সূর্যকে বসালেন কেন্দ্রস্থলে,
আর পৃথিবীকে দিলেন কক্ষপথের একটি জায়গা মাত্র।
কোপারনিকাস জানতেন, এই চিন্তা একদিন ইতিহাস বদলে দেবে,
কিন্তু তিনি প্রস্তুত ছিলেন না এখনই যুদ্ধ শুরু করার।
তিনি লিখলেন নিজের ডায়েরিতে—
“আমি জানি, মানুষ আজ হাসবে, রাগ করবে,
কিন্তু একদিন তারা বুঝবে— আমি শুধু ঈশ্বরের সৃষ্ট সত্যটাই দেখেছি।”
১৫৩০ সাল।
পোল্যান্ডের শান্ত শহর ফ্রমবর্ক— নদীর ধারে স্থির এক পুরোনো শহর।
সেখানেই এক পুরোহিতের কক্ষে, রাতের অন্ধকারে জ্বলছে একটি মোমবাতি।
মোমের আলোয় বসে আছেন নিকোলাস কোপারনিকাস,
সামনে ছড়ানো কাগজ, চিত্র, আর জটিল গণিতের সূত্র।
তিনি লিখছেন—
“সূর্য স্থির, পৃথিবী ঘুরছে।
এই ঘূর্ণনের কারণেই দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটে।”
এই বাক্য ইতিহাসের জন্য ছিল এক অগ্নিবাণী।
কারণ তখনকার ধর্মীয় বিশ্বাস বলত,
“পৃথিবী ঈশ্বরের কেন্দ্র; সবকিছু ঘুরছে তার চারপাশে।”
কোপারনিকাস জানতেন, এই সত্য বলা মানে জীবন বাজি রাখা।
তবু তার কলম থামেনি।
বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ, গণনা আর আত্মদ্বন্দ্বের পর,
১৫৩২ সালে, কোপারনিকাস শেষ করলেন তার যুগান্তকারী বইয়ের প্রথম খসড়া—
“De Revolutionibus Orbium Coelestium”
(বাংলা অর্থে — “আকাশীয় বৃত্তের বিপ্লব সম্পর্কে”)।
এই বইয়ে তিনি বিশদভাবে দেখালেন—
কীভাবে সূর্যকেন্দ্রিক (Heliocentric) তত্ত্বে
গ্রহগুলোর গতি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়,
যেখানে টলেমির পৃথিবী-কেন্দ্রিক তত্ত্বের শত সমস্যা একসাথে মিটে যায়।
তবে তিনি কাউকে বলেননি বইটির কথা।
খসড়াটি রেখে দিলেন নিজের কাঠের বাক্সে,
আর প্রতিরাতে প্রার্থনার পর তার চোখ যেত জানালার বাইরে তারাভরা আকাশে।
তিনি নিজেকে বলতেন,
“সত্য আমার কাছে এসেছে, কিন্তু পৃথিবী কি তা শোনার মতো প্রস্তুত?”
১৫৩৩ সালের মার্চে, রোম শহরে এক পণ্ডিত জর্জ রেটিকাস তার তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।
চার্চের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষেপে ওঠে—
“যে মানুষ বলবে পৃথিবী নড়ে, সে ঈশ্বরকে অস্বীকার করে!”
কোপারনিকাসের নাম তখনো প্রকাশ্যে আসেনি,
তবু তিনি বুঝলেন— সময় এখনো নিরাপদ নয়।
তিনি নিজের শহরেই সীমাবদ্ধ থাকলেন,
আর নতুন করে বইটি সম্পাদনা শুরু করলেন—
ভুল যেন না থাকে, কারণ তিনি জানতেন,
একটি ভুল মানেই তার তত্ত্ব চিরতরে ধ্বংস।
১৫৩৯ সালের মে মাসে, তরুণ গণিতবিদ ও অধ্যাপক জর্জ রেটিকাস
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলেন ফ্রমবর্কে, কোপারনিকাসের কাছে।
তিনি বললেন,
“পুরোহিত মহাশয়, আপনার সূর্যকেন্দ্রিক ধারণা শুনেছি।
দয়া করে আমাকে শেখান।”
প্রথমে কোপারনিকাস দ্বিধায় ছিলেন।
তিনি ভেবেছিলেন, “যদি এই তরুণ আমার নাম প্রকাশ করে ফেলে?”
কিন্তু রেটিকাস ছিল ভিন্ন।
সে জানত, এই তত্ত্ব পৃথিবী বদলে দিতে পারে।
দু’জন একসাথে কাজ শুরু করলেন।
রাতের পর রাত টাওয়ারে উঠে তারা মাপলেন সূর্যের কক্ষপথ, গ্রহের অবস্থান।
রেটিকাস একদিন বললেন,
“আপনি যদি চুপ থাকেন, তবে অন্ধকারই জিতে যাবে।”
সেই কথায় কোপারনিকাসের চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
১৫৪০ সালে, রেটিকাস জার্মানিতে ফিরে গিয়ে
নিজেই প্রকাশ করলেন একটি বই—
“Narratio Prima” (প্রথম বর্ণনা)
যেখানে তিনি কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন।
মানুষ অবাক হলো, কেউ উৎসুক, কেউ ক্ষিপ্ত।
চার্চের প্রভাবশালীরা বলল,
“এই তত্ত্ব বিপজ্জনক— এটি ঈশ্বরের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।”
তবুও, রেটিকাস অনুরোধ করলেন গুরুকে—
“আপনার বইটি প্রকাশ করুন, মহাশয়।
আপনি চুপ থাকলে ইতিহাস আপনাকে ভুলে যাবে।”
অবশেষে কোপারনিকাস রাজি হলেন।
তিনি বললেন,
“হোক, আমি হয়তো তা দেখে যেতে পারব না,
কিন্তু সত্যের আলোকে থামানো যায় না।”
১৫৪২ সালের শেষ দিকে, রেটিকাস বইটি নিয়ে গেলেন জার্মানির নুরেমবার্গে,
যেখানে তা ছাপার প্রস্তুতি শুরু হলো।
১৫৪৩ সালের মে মাস।
বৃদ্ধ কোপারনিকাস তখন মৃত্যুশয্যায়।
তার চোখে আর দেখা যায় না, কিন্তু কানে শুনলেন—
তার বই “De Revolutionibus Orbium Coelestium” প্রকাশিত হয়েছে।
বলা হয়, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে
রেটিকাস বইটির প্রথম মুদ্রিত কপি এনে রাখলেন তার বালিশের পাশে।
কোপারনিকাস কাঁপা হাতে ছুঁয়ে বললেন মৃদু স্বরে,
“এটাই আমার সত্য।”
১৫৪৩ সালের ২৪ মে,
তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন— শান্ত, তৃপ্ত, কিন্তু ইতিহাসের জন্য অমর।
২৪ মে ১৫৪৩, কোপারনিকাসের নিঃশ্বাস থেমে গেল,
কিন্তু তাঁর কলমে লেখা কথা তখনও বেঁচে ছিল—
“পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র।”
তাঁর মৃত্যুর পর বইটি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল ইউরোপের পণ্ডিতদের হাতে।
প্রথমে অনেকেই বুঝতে পারেনি এর গভীরতা,
কারো কাছে এটি ছিল কেবল জটিল গণিতের বই,
কিন্তু কিছু তরুণ বিজ্ঞানীর কাছে এটি ছিল আলোর প্রদীপ।
কোপারনিকাসের মৃত্যুর প্রায় ৫৭ বছর পর,
ইতালির দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনো সাহস করে বললেন—
“কোপারনিকাস ঠিক বলেছিলেন।
সূর্য কেন্দ্র, আর তার বাইরেও অসংখ্য সূর্য ও পৃথিবী আছে।”
এ কথা শোনামাত্র রোমের চার্চ ক্ষেপে গেল।
তারা বলল, “এ মানুষ ঈশ্বরের নিয়ম ভেঙেছে।”
ব্রুনোকে বন্দি করা হলো ১৫৯২ সালে,
আর ১৬০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি,
রোম শহরের Campo de’ Fiori চত্বরে তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
কিন্তু মৃত্যুর আগমুহূর্তে তিনি মাথা উঁচু করে বলেছিলেন—
“তোমরা আগুনে আমার শরীর পুড়িয়ে দিতে পারবে,
কিন্তু সত্যকে নয়।”
তাঁর মুখে উচ্চারিত সেই শব্দগুলোই
কোপারনিকাসের ভাবনার অগ্নিশিখা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সারা ইউরোপে।
গ্যালিলিও গ্যালিলেই, ইতালির এক তরুণ বিজ্ঞানী,
কোপারনিকাসের বই পড়ে মুগ্ধ হন।
তিনি নিজের হাতে তৈরি করলেন দূরবীন,
এবং প্রথমবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন—
-
শুক্র গ্রহের বিভিন্ন পর্যায় (ফেজ)
-
বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ (Io, Europa, Ganymede, Callisto)
-
সূর্যের কালো দাগ
এসব দেখে তিনি ঘোষণা দিলেন—
“কোপারনিকাস ভুল বলেননি, সত্যিই পৃথিবী ঘুরছে!”
কিন্তু চার্চ সহ্য করতে পারল না।
তাকে ১৬৩৩ সালে আদালতে তোলা হলো।
বলা হলো, যদি তিনি “পৃথিবী স্থির” বলেন, তবে প্রাণে বাঁচবেন।
তিনি অনিচ্ছায় লিখিত স্বীকারোক্তি দিলেন,
তবু কক্ষে বেরিয়ে এসে ধীরে বলেছিলেন—
“Eppur si muove” — “তবুও সে ঘুরছে।”
তাকে আজীবন গৃহবন্দী রাখা হয়,
কিন্তু পৃথিবী ততদিনে কোপারনিকাসের পথে হেঁটে গেছে।
১৬৮৭ সালে, ইংরেজ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত বই “Principia Mathematica”। সেখানে তিনি দেখালেন,
গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে ঘুরছে মহাকর্ষ বলের কারণে।
এবার আর কেউ সন্দেহ করতে পারল না।
কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব
নিউটনের গণিতের ভরসায় চিরস্থায়ী হয়ে গেল।
দীর্ঘ তিন শতাব্দী পর, ১৮২২ সালে ভ্যাটিকান চার্চ অবশেষে স্বীকার করল— “কোপারনিকাস ও গ্যালিলিওর তত্ত্ব ধর্মবিরোধী নয়, বরং সত্য।”
তখন পৃথিবী ঘুরছিল ঠিক যেমনটা কোপারনিকাস বলেছিলেন, কিন্তু এখন মানুষও ঘুরতে শুরু করল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে।
-
১৯৭৯ সালে, পোপ জন পল II ঘোষণা দেন— “চার্চের ভুল হয়েছিল। গ্যালিলিও ও কোপারনিকাস সত্য বলেছিলেন।”
-
২০০৯ সালে, নাসা ও বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কোপারনিকাসের ৫৩৬তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে “Modern Astronomy-এর জনক” বলে ঘোষণা দেন।
কোপারনিকাসের মৃত্যু হয়েছিল শান্তভাবে,
কিন্তু তাঁর ধারণা জ্বালিয়ে দিয়েছিল এক নতুন সূর্য।
ব্রুনো সেই আগুনে পুড়ে শহীদ হয়েছিলেন,
গ্যালিলিও চোখে আলো হারিয়ে হলেও সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন,
নিউটন তার নিয়ম দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন সেই সত্য।
আজ আমরা যখন বলি— “পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে,”
তখন আসলে আমরা বলি— “কোপারনিকাস এখনো বেঁচে আছেন।”
কোপারনিকাসের গল্প কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানের নয়, এটি চিন্তার মুক্তির গল্প।
তিনি শিখিয়েছিলেন—৷ “যদি সত্য তোমার পাশে থাকে, তবে সারা দুনিয়া বিরোধিতা করলেও ভয় পেও না।”
তার হাতেই শুরু হয়েছিল আধুনিক বিজ্ঞান যুগের ভোর। পৃথিবী নয়, সূর্যই কেন্দ্র — আর মানুষই তার জ্ঞানের আলোয় ঘুরে চলেছে চিরকাল।