চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না
চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না
লেখক: মোঃ জয়নাল আবেদীন
সকালটা ছিল অন্যসব দিনের মতোই — কিন্তু রাকিবের মনে আজ এক অদ্ভুত অস্থিরতা। গ্রামের মাটির ঘর থেকে বেরিয়ে যখন সে আকাশের দিকে তাকালো, সূর্যের আলোটা যেন একটু বেশি ঝলমলে মনে হলো। হয়তো কারণ, আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার দিন — শুধু বোর্ড পরীক্ষা নয়, জীবনের পরীক্ষা।
রাকিবের জন্ম ছোট এক গ্রামে, নদীর পাড়ে। বাবা ছিলেন হালকা অসুস্থ, দিনমজুরের কাজ করতেন, মা গ্রামের অন্য ঘরে কাপড় সেলাই করে সংসার চালাতেন। ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম—সব সময় জানতে চাইত, “কেন আকাশ নীল?” “মানুষ কেন হারে?” “পরিশ্রম করলে কি সত্যিই সব পাওয়া যায়?”
মায়ের চোখে জল আসত, কিন্তু মুখে হাসি দিয়ে বলতেন,
“বাবা, চেষ্টা করলে মানুষ হারেও না, হোঁচট খায় শুধু।”
এই কথাটাই যেন রাকিবের জীবনের মন্ত্র হয়ে গিয়েছিল।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় তার জুতো ছিল না। কখনো খালি পায়ে, কখনো পুরনো ছেঁড়া স্যান্ডেল পরে স্কুলে যেত। সহপাঠীরা হাসত, কেউ কেউ দূরে থাকত, কিন্তু শিক্ষক মনির স্যার সবসময় বলতেন,
“রাকিব, তুই পড়াশোনায় মন দে। একদিন তুইই প্রমাণ করবি, কারও জুতোর দাম নয়—চেষ্টার দামই আসল।”
রাকিবের চোখে সেই সময় একটা স্বপ্ন জন্ম নিল—নিজেকে প্রমাণ করা।
রাতের বেলা যখন গ্রামে বিদ্যুৎ থাকত না, তখন কেরোসিন বাতির নিচে বসে পড়ত। মায়ের সেলাই মেশিনের শব্দের সাথে তার বইয়ের পৃষ্ঠার উল্টানো শব্দ মিশে যেত।
তাকে দেখে মা বলতেন,
“তুই এত কষ্ট করিস কেন রে?”
রাকিব হেসে বলত,
“মা, আমি তোমার কষ্ট কমানোর জন্যই কষ্ট করি।”
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাকিব দেখল, কয়েকজন ধনী পরিবারের ছেলে নতুন সাইকেলে চড়ে যাচ্ছে। তাদের হাতে দামি ঘড়ি, গায়ে ব্র্যান্ডেড জামা। রাকিবের চোখে মুহূর্তে একটা হালকা কষ্টের ছায়া পড়ল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল মায়ের কথা—
“অন্যের হাতে যা আছে তা নয়, নিজের হাতে যা আছে সেটাই গর্বের।”
রাকিব মাথা উঁচু করে হাঁটল।
সে জানত, তার কাছে এখন বই আছে, স্বপ্ন আছে, আর আছে হাল না ছাড়ার মনোভাব।
বছর ঘুরে গেল। এসএসসি পরীক্ষার দিন এসে গেল। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে সে মায়ের পা ছুঁয়ে বলল,
“মা, দোয়া করো, আমি আজ তোমার মুখ উজ্জ্বল করব।”
মা চোখ মুছে বললেন,
“আমি জানি তুই পারবি রে বাবা। চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না, সেখানেই জয়ের শুরু।”
কিন্তু ভাগ্য সবসময় সহজ পথ দেখায় না।
পরীক্ষার কয়েকদিন আগে তাদের ঘরে আগুন লেগে যায়—বইপত্র, খাতা, সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
রাকিবের বুক ভেঙে গেল। সে নদীর ধারে বসে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
মনে হচ্ছিল সব শেষ।
ঠিক তখন পাশের গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক আব্দুল কাদের মিয়া এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“বাবা, তোর চেষ্টা আগুনে পুড়বে না। বই পুড়েছে, মন তো নয়!”
সেই কথাটা যেন নতুন করে জীবন দিল রাকিবকে।
রাত জেগে সে পুরনো নোটবুক জোগাড় করল, অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে নোট নিয়ে আবার পড়া শুরু করল।
চোখ লাল, মুখ ক্লান্ত—তবু মনে জ্বলছিল এক আগুন।
“আমার চেষ্টা থামবে না।”
পরীক্ষা শেষ হলো। ফলাফল প্রকাশের দিন পুরো গ্রাম জড়ো হলো স্কুলে।
যখন তালিকা ঝুলল বোর্ডে, রাকিব প্রথম স্থানে!
মনির স্যার দৌড়ে এসে রাকিবকে জড়িয়ে ধরলেন,
“দেখলি তো? চেষ্টা যেখানে থামে না, সেখানেই জয়ের শুরু!”
মায়ের চোখে তখন আনন্দের জল, গর্বের হাসি।
রাকিবের হৃদয় কেঁপে উঠল — সে জানল, এটা শুধু ফল নয়, তার পরিশ্রমের প্রমাণ।
রাকিবের গ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সবাই বলল, “ছেলেটা আশ্চর্য মেধাবী!”
কেউ উপহার দিল, কেউ আশীর্বাদ করল। কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেও রাকিবের মনে ছিল একটাই চিন্তা —
“আমি এখানেই থেমে থাকতে পারি না।”
কলেজে ভর্তি হতে সে শহরে এল।
নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন ভয়।
গ্রামের সরল ছেলে হঠাৎ শহরের ভিড়ে হারিয়ে গেল যেন।
হোস্টেলে জায়গা হলো না, তাই এক গ্যারেজের উপরের ছোট ঘরে থাকতে শুরু করল।
রাত হলে নিচে মোটরসাইকেলের আওয়াজ, গরমে নিদ্রাহীন রাত, আর সকালে ক্লাসে ঘুমে চোখ ভারী।
কিন্তু রাকিব জানত—এই কষ্ট সাময়িক।
সে নিজেকে বোঝাত,
“যে মানুষ কেরোসিন বাতির নিচে পড়ে পারে, সে শহরের আলোতেও পারবে।”
প্রথম ক’দিন পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ খুঁজতে লাগল।
একটা দোকানে বিক্রেতা হিসেবে সুযোগ পেল — দিনে কলেজ, রাতে দোকান।
মাসে সামান্য টাকাই পেত, কিন্তু সেটাই ছিল তার মায়ের জন্য গর্বের বিষয়।
প্রতিদিন ক্লান্ত শরীরে ফেরার সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত,
“হে আল্লাহ, আমি শুধু একটু সুযোগ চাই। চেষ্টা আমি করব।”
একদিন দোকানে বসা অবস্থায় হঠাৎ ফোন এলো —
মা অসুস্থ। গ্রামের ছোট হাসপাতালে ভর্তি।
রাকিব সবকিছু ছেড়ে দৌড়ে চলে গেল গ্রামে।
মাকে দেখে বুক কেঁপে উঠল — কাঁপা কণ্ঠে মা বললেন,
“বাবা, আমি জানি তুই একদিন বড় হবি। কিন্তু এখন থেকে একটু নিজের খেয়াল রাখ।”
রাকিব বুঝল, জীবনের ভার এখন পুরোপুরি তার কাঁধে।
মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে দোকান, টিউশন, ক্লাস — সব সামলাতে লাগল একসাথে।
রাতের পর রাত জেগে পড়ত, সকালে টিউশন, বিকেলে ক্লাস, রাতে দোকান।
কখনো কখনো পেট খালি, চোখে ঘুম নেই—তবু মন বলত,
“থামিস না রাকিব, এখন থামলে সব শেষ।”
একদিন কলেজে একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা হলো।
রাকিবকে স্যার নাম লিখিয়ে দিলেন জোর করে।
সে প্রথমে ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বলল —
“জীবন মানেই সংগ্রাম। যে চেষ্টা থামায় না, সে-ই আসল বিজয়ী।”
পুরো অডিটোরিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শেষে করতালির শব্দে মুখরিত হলো হলরুম।
রাকিব প্রথম স্থান পেল।
এটা তার জীবনের প্রথম শহুরে জয় — আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম।
সেই প্রতিযোগিতা থেকেই তাকে চিনে নিলো এক স্থানীয় সাংবাদিক।
পরের সপ্তাহে পত্রিকায় শিরোনাম হলো —
📰 “দারিদ্র্য জয় করে উঠে আসা রাকিব: চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না।”
এ খবর ছড়িয়ে পড়ল তার কলেজ, গ্রাম, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও।
রাকিবের চোখে জল এসে গেল — এই প্রথম সে বুঝল,
তার গল্প কেবল নিজের নয়, অসংখ্য মানুষের প্রেরণার গল্প।
এরপর থেকে রাকিব অন্যদেরও সাহায্য করতে লাগল।
যারা হতাশ হয়ে পড়ত, তাদের বলত,
“তুমি এখন যেখানেই থাকো, থেমে যেও না। চেষ্টা চালিয়ে যাও। জীবন একদিন তোমাকে পুরস্কার দেবে।”
সে নিজের মতো করে “চেষ্টা ক্লাব” নামের ছোট একটা গ্রুপ তৈরি করল—
যেখানে দরিদ্র ছাত্ররা একে অপরকে সাহায্য করত বই, নোট আর অনুপ্রেরণা দিয়ে।
প্রতিদিন রাতে সে মায়ের কাছে ফোন করে বলত,
“মা, আমি এখন অন্যদেরও শেখাচ্ছি, হাল না ছাড়তে।”
মা হেসে বলতেন,
“তুই শুধু নিজে জিতিস না রে বাবা, অন্যদেরও জিততে শেখাস।”
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
এক রাতে রাকিবের দোকান থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় —
ওই ব্যাগেই ছিল পরীক্ষার ফর্মের টাকা, টিউশন থেকে পাওয়া কষ্টার্জিত সব টাকা।
সে রাস্তায় বসে কাঁদতে লাগল।
বুকে কেমন শূন্যতা, মনে ভয় — এবার হয়তো সব শেষ।
তবু ভেতর থেকে এক কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠল,
“চেষ্টা থামাবি না, রাকিব।”
পরদিন সকালে রাকিব কলেজে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা লুকাল।
কারও কাছেই হাত পাতল না।
বরং আরও বেশি পরিশ্রম করল — দিনে দুইটা, রাতে তিনটা টিউশন শুরু করল।
মাস শেষে আবার টাকা জমিয়ে পরীক্ষার ফি দিল।
সে জানত, যে পড়ে যায় কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়, সেই আসল যোদ্ধা।
ধীরে ধীরে শহরও যেন তাকে চিনে নিতে লাগল।
শিক্ষকরা বলতেন, “রাকিব, তুই অনুপ্রেরণা।”
বন্ধুরা বলত, “তোর মতো অধ্যবসায়ী মানুষ আমরা দেখিনি।”
কিন্তু রাকিব নিজে জানত—সে এখনও চলার পথে, গন্তব্যে নয়।
কারণ তার বিশ্বাস,
“যে মানুষ একবার হাল ছেড়ে দেয়, সে কখনো জানে না তার কতটা শক্তি ছিল।”
সময় যেন গড়িয়ে গেল চোখের পলকে।
রাকিব কলেজ শেষ করে ভর্তি হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে — গণিত বিভাগে।
সে জানত, এই বিষয়টা কঠিন, কিন্তু চ্যালেঞ্জই তো তাকে টানে।
মায়ের মুখে তখন নতুন হাসি, “আমার ছেলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র!”
শহরে উঠে রাকিব ভেবেছিল এবার হয়তো একটু শান্তি পাবে, কিন্তু জীবন সবসময় যেমন, এবারও নতুন পরীক্ষা সামনে আনল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী, কারও কাছে কোচিং নোট, কারও কাছে দামি বই, কারও কাছে ল্যাপটপ।
রাকিবের কাছে শুধু পুরনো একটা নোটবুক আর কলম।
প্রথম কয়েকদিন সে নিজেকে খুব একা মনে করল।
ল্যাবের কাজ বুঝতে পারত না, টিচারদের ইংরেজি উচ্চারণে গুলিয়ে যেত, বন্ধুরা হাসত।
রাতে একা বসে নিজের পুরনো ডায়েরিতে লিখল—
“আমি কি সত্যিই পারব?”
তারপর আবার নিজের হাতের লেখা পড়ল,
“চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না…”
এবং চোখের কোণে আসা জল মুছে ফেলল।
প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় রাকিব ফেল করল একটিতে।
এটা যেন তার হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধল।
যে ছেলে স্কুল-কলেজে সবসময় প্রথম হয়েছে, সে এবার ব্যর্থ।
বাড়ি থেকে ফোন এলো — মা জানতে চাইলেন,
“ফলাফল কেমন হলো বাবা?”
রাকিব কিছু বলতে পারল না, শুধু বলল,
“মা, আমি চেষ্টা করছি।”
সেদিন রাতে সে রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
শহরের আলো, গাড়ির শব্দ, দোকানের ভিড়—সবকিছু যেন তাকে তুচ্ছ লাগছিল।
একটা নির্জন পার্কে বসে সে নিজের জীবনের সব ব্যর্থতা মনে করতে লাগল।
কেন বারবার কষ্ট আসে? কেন মানুষকে এত লড়তে হয়?
ঠিক তখন পাশে বসা এক বৃদ্ধ বললেন,
“বাবা, জানিস, পাহাড় যত উঁচু হয়, তার চূড়ায় ওঠার কষ্টও তত বেশি। কিন্তু দৃশ্যও তত সুন্দর।”
রাকিব তাকিয়ে দেখল—লোকটা মৃদু হাসছেন, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি।
মনে হলো, এ যেন আল্লাহ্র পাঠানো কোনো বার্তা।
পরদিন ভোরে রাকিব নিজের বই খুলে বসে গেল।
বাইরের সূর্য তখনও পুরো ওঠেনি, তবু তার চোখে নতুন আলো।
সে একাগ্র মনে পড়তে শুরু করল।
প্রতিদিন রাতে পড়ার টেবিলে একটা ছোট কাগজে লিখে রাখত —
“চেষ্টা থামাবি না।”
সে নিজের রুটিন তৈরি করল —
দুই মাস টানা পরিশ্রমের পর সে বুঝল, এবার সে সত্যিই প্রস্তুত।
পরবর্তী সেমিস্টারের ফলাফল বের হলো —
রাকিব শুধু পাশই করল না, বরং ক্লাসে প্রথম!
শিক্ষকরা অবাক হয়ে গেলেন, বন্ধুরা তাকিয়ে রইল তার দিকে।
মনির স্যার (যিনি স্কুলে তাকে পড়াতেন) খবর শুনে ফোন করলেন,
“দেখলি তো রাকিব, তুই কখনো হারিস না।”
রাকিব হেসে বলল,
“স্যার, আমি শুধু মনে রেখেছি—চেষ্টা যেখানে থামে না, সেখানেই জয়ের শুরু।”
ধীরে ধীরে রাকিবের নাম ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলতেন,
“এই ছেলেটা পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যদেরও শেখায় কিভাবে হাল না ছাড়তে হয়।”
সে সপ্তাহে একদিন সময় দিত —
বিশ্ববিদ্যালয়ের গরিব ছাত্রদের জন্য ফ্রি গণিত ক্লাস নিত।
কেউ বই না পেলে, নিজের নোট কপি করে দিত।
কেউ ভেঙে পড়লে বলত,
“তুই শুধু একটা কথা মনে রাখ — চেষ্টা থামাস না।”
একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে “ইনোভেশন কনটেস্ট” হলো।
বিষয়: “বাংলাদেশের গ্রামীণ শিক্ষায় পরিবর্তনের উপায়।”
রাকিব নিজের গ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে একটা পরিকল্পনা তৈরি করল —
একটা অ্যাপ, যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিনামূল্যে পড়াশোনার ভিডিও ও নোট পাবে।
বন্ধুরা হাসল, বলল,
“তুই কীভাবে অ্যাপ বানাবি? তোর তো ল্যাপটপই নেই!”
রাকিব চুপ করল না।
লাইব্রেরির কম্পিউটার ব্যবহার করে, ইউটিউব দেখে, নিজের হাতে কোডিং শিখে ফেলল।
দিনরাত ঘুম না গিয়ে সে নিজের স্বপ্নে ডুবে গেল।
প্রতিযোগিতার দিন এলো।
সবাই অবাক — রাকিবের প্রজেক্ট শুধু বাস্তবসম্মতই নয়, বরং সবচেয়ে মানবিক।
বিচারকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন।
রাকিব পেল প্রথম পুরস্কার — এবং সাথে ৫০,০০০ টাকার স্কলারশিপ!
সে সেই টাকা দিয়ে প্রথমে করল কী জানো?
একটা ল্যাপটপ কিনল, আর বাকিটা পাঠাল মায়ের হাতে।
ফোনে বলল,
“মা, এখন থেকে আমার পড়াশোনা তোমার জন্য, আমার দেশের জন্য।”
মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“তুই আমার গর্ব রে বাবা। তোর চেষ্টা আল্লাহ্ বরকত দিন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই যখন চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, রাকিব তখনও নিজের অ্যাপ প্রজেক্ট নিয়েই মগ্ন।
সে ভাবল, “আমি যদি সত্যিই চেষ্টার মূল্য বুঝি, তবে সেটা শুধু নিজের জীবনে নয় — অন্যের জীবনেও ছড়িয়ে দিতে হবে।”
কিন্তু বাস্তবতা বড় কঠিন।
অ্যাপের সার্ভার ফি দিতে না পারায় একসময় সেটি বন্ধ হয়ে গেল।
রাকিবের মন ভেঙে গেল, যেন তার সমস্ত পরিশ্রম হারিয়ে গেছে।
বন্ধুরা কেউ কেউ ভালো চাকরি পেল, কেউ বিদেশে চলে গেল।
রাকিব শুধু চেষ্টা করে গেল — দিনরাত সরকারি চাকরির প্রস্তুতি, টিউশন, আর ছোটখাটো প্রজেক্ট।
তবু বারবার ব্যর্থতা তার দরজায় কড়া নাড়ল।
একদিন ভীষণ কষ্টে রাকিব চুপচাপ নিজের রুমে বসে ছিল।
বিদ্যুৎ চলে গেছে, টেবিলে মোমবাতি জ্বলছে।
সে একটুখানি কাগজে লিখল—
“আমি এত চেষ্টা করেও সফল হচ্ছি না কেন?”
ঠিক তখন দরজায় কড়া পড়ল।
দেখল, পাশের বাড়ির ছোট ছেলেটা এসেছে —
হাতে খাতা, বলল,
“ভাইয়া, আমার গণিতের সমস্যা হচ্ছে, একটু বুঝিয়ে দিন।”
রাকিব মৃদু হাসল, ক্লান্ত চোখে তাকাল ছেলেটার দিকে।
তারপর বলল,
“আচ্ছা, বস, দেখি।”
দু’জন বসে সমস্যাটা সমাধান করতে করতে রাকিব হঠাৎ খেয়াল করল—
ছেলেটা যেভাবে খুশি হয়ে উত্তরটা লিখছে, সেটি দেখে তার বুক ভরে উঠল আনন্দে।
মনে হলো, “আমি হয়তো বড় চাকরি পাইনি, কিন্তু আমি কারো জীবনে আলো জ্বালাতে পারছি।”
সেই দিন থেকেই রাকিব নতুন এক সিদ্ধান্ত নিল —
সে নিজের এলাকায় বিনামূল্যে শিক্ষা সহায়তা কেন্দ্র খুলবে।
রাকিবের হাতে তখন কোনো টাকা নেই, তবু মন ভরা আগুন।
সে নিজের পুরনো বই, নোট, এবং বন্ধুদের দেওয়া পুরনো টেবিল-চেয়ার নিয়ে একটা ছোট ঘর ভাড়া করল।
ঘরের নাম দিল —
“চেষ্টা ফাউন্ডেশন”
প্রথম দিন ক্লাসে এসেছিল মাত্র তিনজন ছাত্র।
রাকিব তাদের দেখে বলল,
“তোমরা যত কমই হও না কেন, তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটা সম্ভাবনা আছে। চেষ্টা করলে তোমরাও পারবে।”
ধীরে ধীরে সেই তিনজনের সংখ্যা বাড়তে লাগল — ১০, তারপর ৩০, তারপর ১০০!
রাকিব নিজেই পড়াত, নিজের তৈরি নোট বিতরণ করত, এবং প্রতিদিন শেষে বোর্ডে একটা বাক্য লিখে রাখত —
“চেষ্টা যেখানে থামে না, সেখানেই জয়ের শুরু।”
একদিন উপজেলা চেয়ারম্যান এসে দেখলেন, এই তরুণ কোনো অর্থ ছাড়াই গ্রামের শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে পড়াচ্ছে।
তিনি অবাক হয়ে বললেন,
“তুমি আমাদের গ্রামের গর্ব, রাকিব। তোমার জন্য আমরা একটা ভবন বরাদ্দ করব।”
রাকিব কেঁদে ফেলল।
সে বলল,
“স্যার, আমি শুধু চেয়েছিলাম আমার মতো আর কেউ যেন হতাশ না হয়।”
সেই থেকে শুরু হলো “চেষ্টা ফাউন্ডেশন”-এর নতুন যাত্রা।
একটা পাকা ভবন, একটা কম্পিউটার ল্যাব, আর একটা ছোট লাইব্রেরি — সব মিলিয়ে এক টুকরো স্বপ্নের জগৎ।
প্রতিদিন রাকিব সকালেই উঠে ফজরের নামাজ শেষে লেখাপড়ার পরিকল্পনা করত,
আর বিকেলে বাচ্চাদের শেখাত কিভাবে কষ্টকে ভয় না পেতে হয়।
একদিন তার এক ছাত্র — মেহেদী — এসে বলল,
“ভাইয়া, আমি ফেল করেছি। আমার দিয়ে কিছু হবে না।”
রাকিব তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুই জানিস, আমি একসময় তোর মতোই ভাবতাম। কিন্তু তুই যদি থেমে যাস, তবে ব্যর্থতা জিতে যাবে। চেষ্টা চালিয়ে যা।”
মেহেদী পরে সেই বছরেই প্রথম হয়ে গেল বোর্ড পরীক্ষায়।
পত্রিকায় খবর বের হলো — “গ্রামের রাকিবের ফাউন্ডেশন বদলে দিচ্ছে শতাধিক শিশুর ভাগ্য।”
ঢাকা থেকে একদিন আমন্ত্রণ এলো —
একটি বড় শিক্ষা সম্মেলনে “অনুপ্রেরণার মুখ” হিসেবে রাকিবকে বক্তৃতা দিতে বলা হলো।
স্টেজে উঠে সে বলল,
“আমার হাতে কোনো জাদু নেই, আমার কাছে বড় কোনো ডিগ্রি নেই। আমি শুধু জানি — চেষ্টা থামানো মানে স্বপ্নকে মেরে ফেলা।”
হলভর্তি মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দিল।
তার চোখে তখন জল — কিন্তু সেটা আনন্দের।
রাকিব বাড়ি ফিরল।
দরজায় দাঁড়িয়ে মা অপেক্ষা করছিলেন, হাতে কোরআন।
ছেলেকে দেখে বললেন,
“আজ তুই সত্যিকারের মানুষ হয়েছিস রে বাবা।”
রাকিব মাকে বুকে টেনে নিয়ে বলল,
“তুমি শিখিয়েছ মা—চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না, সেখানে জীবনও হেরে যায় না।”
মায়ের চোখ ভিজে গেল, কিন্তু মুখে হাসি।
রাকিব এখন গ্রামের অসংখ্য তরুণ-তরুণীর প্রেরণা।
তার ফাউন্ডেশন থেকে অনেকে চাকরি পেয়েছে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, কেউ বিদেশে স্কলারশিপ পেয়েছে।
একদিন রাকিব নিজের ডায়েরিতে লিখল—
“আমি কোনো রাজা নই, কোনো ধনী মানুষও নই।
কিন্তু আমি নিজের চেষ্টা দিয়ে দেখিয়েছি, মানুষ চাইলে আলো জ্বালাতে পারে।
আর সেই আলোই ছড়িয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।”
দিন কেটে যায়, বছর ঘুরে আসে।
“চেষ্টা ফাউন্ডেশন” এখন আর ছোট্ট ঘরে সীমাবদ্ধ নেই।
এখন তার শাখা খুলেছে আরও তিনটি জেলায়।
রাকিবের স্বপ্নের বীজ ছড়িয়ে পড়েছে দূর-দূরান্তে।
গ্রামের গরিব ছাত্রছাত্রীরা এখন অনলাইনে যুক্ত হয় তার ক্লাসে।
তার ইউটিউব চ্যানেলে লাখ লাখ ভিউ,
আর মানুষ তাকে ডাকে— “প্রেরণার শিক্ষক” বলে।
একদিন বিদেশি এক সংস্থা “গ্লোবাল ইয়ুথ ইনস্পিরেশন অ্যাওয়ার্ড” ঘোষণা করল।
তাদের চোখে রাকিবের গল্পটা ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত —
এক তরুণ, যে নিজের ব্যর্থতাকে পাথেয় করে শত মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।
রাকিব প্রথমবার বিমানে উঠল।
ঢাকার মাটির গন্ধ পেছনে ফেলে যখন আকাশে উঠছিল, তার চোখে ভেসে উঠছিল মা, গ্রাম, আর ছোট্ট সেই ঘর— যেখানে প্রথম “চেষ্টা ফাউন্ডেশন” শুরু হয়েছিল।
ইউরোপের এক বিশাল কনফারেন্স হলে রাকিব দাঁড়িয়ে।
তার সামনে বসা শত শত তরুণ, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ।
হলভর্তি মানুষ শুনছে বাংলাদেশের এক ছেলের কণ্ঠ—
“আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার হাতে ছিল শুধু স্বপ্ন।
আমি জানতাম না কতবার ফেল করব, কতবার কাঁদব।
কিন্তু জানতাম—চেষ্টা থামালে স্বপ্নও থেমে যাবে।”
মুহূর্তেই তুমুল করতালি।
বিচারকরা এগিয়ে এসে তার হাতে তুলে দিলেন সম্মাননা ক্রেস্ট—
“গ্লোবাল ইনস্পিরেশন অ্যাওয়ার্ড ২০২৮”
রাকিব মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলল।
তার চোখে ভাসছিল মায়ের মুখ, ছোট্ট টেবিল, মোমবাতির আলো, আর তার নিজের প্রথম ডায়েরির লেখা—
“চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না…”
দেশে ফিরে এসে রাকিবের জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
সে বুঝল, নিজের অভিজ্ঞতা শুধু মুখে নয় — বইয়ে লিখে রেখে যেতে হবে।
তাহলে হয়তো আরও বহু তরুণ, যারা এখনো ব্যর্থতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, তারা আলো খুঁজে পাবে।
সে লিখতে শুরু করল—
একটা বই, যার নাম রাখল “চেষ্টা”।
বইয়ে সে নিজের ব্যর্থতার গল্প লিখল, প্রথম টিউশনের অভিজ্ঞতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাকীত্ব, গ্রামের সেই ফাউন্ডেশনের লড়াই—সব।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, সে লিখল মানুষের ভিতরের শক্তির কথা।
বইটি প্রকাশের পর মুহূর্তেই ভাইরাল হলো।
বাংলাদেশের হাজার তরুণ বলল—
“এই বইটা আমাদের জীবনের আয়না।”
রাকিব এখন আর শুধু শিক্ষক নয়,
সে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
যখনই কেউ জীবনে ভেঙে পড়ে, তার বই পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়।
একদিন এক মেয়ে তার অফিসে এসে বলল,
“ভাইয়া, আমি আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু আপনার বই পড়ার পর আমি জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি।”
রাকিব শুনে কেঁপে উঠল।
চোখ ভিজে গেল, কিন্তু মনে শান্তি এলো।
সে বুঝল, তার জীবনের কষ্টগুলো বৃথা যায়নি।
সেগুলোই অন্যের বাঁচার কারণ হয়ে উঠেছে।
রাকিব এবার নতুন এক প্রকল্প শুরু করল —
“চেষ্টা গ্লোবাল নেটওয়ার্ক”
এর মাধ্যমে সে অনলাইনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের যুক্ত করছে,
যেখানে তারা নিজেদের ব্যর্থতার গল্প শেয়ার করে,
আর শেখে কিভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে শুরু হওয়া এই প্ল্যাটফর্ম এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নেপাল, ও আফ্রিকাতেও ছড়িয়ে গেছে।
প্রতি সপ্তাহে “চেষ্টা টকস” নামে অনলাইন সেমিনার হয়,
যেখানে রাকিব বলে—
“তোমার স্বপ্ন বড় হোক, তবুও ভয় পেয়ো না।
কারণ ভয় কেবল তাদের জন্য, যারা চেষ্টা থামিয়ে দেয়।”
সময় পেরিয়ে যায়।
মা এখন বয়স্ক।
একদিন মৃদু অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে বললেন,
“রাকিব, আমি যদি না থাকি, তুই এই ‘চেষ্টা’টা চালিয়ে যাস।
যতদিন একটা শিশু হাসতে শেখে, ততদিন তুই হেরে যাস না।”
রাকিব চোখে জল নিয়ে বলল,
“মা, চেষ্টা যেখানে থামে না, তোমার আশীর্বাদও সেখানেই থাকবে।”
কয়েকদিন পর মা চিরবিদায় নিলেন।
রাকিব মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ করল—
“আমি এখন থেকে আরও বেশি মানুষকে অনুপ্রাণিত করব, মা।
তুমিই আমার প্রথম শিক্ষক, আমার প্রথম ‘চেষ্টা।’”
আজ রাকিবের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
তার ফাউন্ডেশনে কাজ করছে শতাধিক শিক্ষক,
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শত শত ছাত্রছাত্রী তার উদ্যোগে পড়াশোনা করছে বিনামূল্যে।
সরকার তাকে শিক্ষা পুরস্কারে ভূষিত করেছে,
জাতিসংঘে বক্তৃতা দিয়েছে সে,
আর তার বই “চেষ্টা” অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, ফরাসি, আরবি, ও জাপানি ভাষায়।
এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করল,
“আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?”
রাকিব মৃদু হেসে বলল,
“মানুষের শক্তি তার জ্ঞানে নয়, তার চেষ্টায়।
আমি আজও চেষ্টা করছি — কারণ আমি জানি,
চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না, সেখানেই জীবন নতুন করে শুরু হয়।”
সময়ের চাকা কারো জন্য থেমে থাকে না।
রাকিবের মাথায় এখন পাকাচুল, চোখে চশমা, কিন্তু তার মুখের সেই হাসিটা ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বল।
“চেষ্টা ফাউন্ডেশন” এখন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মানবিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, পাহাড়, চর, এমনকি উপকূলীয় গ্রামেও পৌঁছে গেছে তার উদ্যোগের ছোঁয়া।
প্রতিদিন সকালে ফাউন্ডেশনের বড় ভবনে ঢোকার আগে রাকিব থেমে যায় সামান্যক্ষণ।
মায়ের নাম লেখা ছোট্ট ফলকে হাত রাখে, আর চোখ বন্ধ করে বলে—
“মা, তোমার আশীর্বাদেই আমি আজও চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
রাকিবের মনের ভেতরে তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে —
দেশের দরিদ্র, কিন্তু মেধাবী ছেলেমেয়েদের জন্য এমন এক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা,
যেখানে টাকা নয়, মূল মূল্য হবে চেষ্টা।
সে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও, প্রবাসী বাংলাদেশি ও প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
সবাই বলল, “রাকিব ভাই, আপনি যেভাবে চেষ্টার মানে শিখিয়েছেন, আমরা সেই স্বপ্নে পাশে আছি।”
দুই বছরের পরিকল্পনা, তিন বছরের নির্মাণ —
শেষমেশ ২০৩৫ সালে উদ্বোধন হলো “চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়।”
ভবনের প্রবেশদ্বারে বড় অক্ষরে লেখা—
“এখানে টাকা নয়, চেষ্টাই টিকিট।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হলো তিনশত তরুণ-তরুণী।
তাদের অনেকেই দরিদ্র পরিবারের, কারও বাবা দিনমজুর, কেউ এতিম, কেউ গ্রামে শিক্ষক হতে চায়।
রাকিব প্রথম ক্লাসে এসে বলল—
“তোমরা সবাই আমার স্বপ্নের সন্তান।
আমি চেয়েছিলাম এমন এক জায়গা, যেখানে চেষ্টা থেমে থাকবে না।
তোমরা সেটাই বাঁচিয়ে রাখবে।”
তরুণদের চোখে তখন আগুনের মতো উজ্জ্বলতা।
তারা জানত, এটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটা এক চেতনার বিদ্যালয়।
রাকিবের কাজের কথা ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে।
জাতিসংঘ শিক্ষা সংস্থা (UNESCO) “চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়”-কে ঘোষণা করল
“বিশ্বের সেরা মানবিক শিক্ষা উদ্যোগ।”
রাকিবকে সম্মান জানাতে ঢাকায় এক বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলো।
রাষ্ট্রপতি নিজ হাতে তাকে “জাতীয় অনুপ্রেরণা পদক” দিলেন।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে রাকিব বলল—
“আমি কোনো বড় মানুষ নই।
আমি শুধু এক সময় ব্যর্থ হয়েছিলাম,
আর সেই ব্যর্থতাই আমাকে চেষ্টা শিখিয়েছে।”
বছর কেটে যায়।
রাকিব এখন বৃদ্ধ, কিন্তু প্রতিদিন সকালে সে এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানে আসে,
ছাত্রদের সঙ্গে বসে চা খায়, গল্প করে, আর তাদের বলে—
“তোমরা ব্যর্থ হতে ভয় পেয়ো না। ব্যর্থতা মানে শেখার নতুন সুযোগ।”
তার প্রিয় ছাত্র শাওন এখন “চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়”-এর অধ্যক্ষ।
সে রাকিবের চোখে মায়া আর দৃঢ়তার মিলন দেখে অনুপ্রাণিত হয়।
একদিন রাকিব তাকে বলল,
“শাওন, আমি জানি, আমার সময় শেষের দিকে।
কিন্তু আমার এই ‘চেষ্টা’ যেন কখনও থেমে না যায়।”
শাওন কেঁদে বলল,
“স্যার, আমরা সবাই আপনার চেষ্টার ফল। আপনার আলো আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নিয়ে যাব।”
এক শীতের সকালে রাকিবের শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
ছাত্ররা ছুটে এল, ডাক্তার ডাকল, কিন্তু রাকিব শান্ত কণ্ঠে বলল—
“আমি ভালো আছি। আমি শুধু একটু বিশ্রাম নিতে চাই।”
তার হাতে তখন একটা ছোট্ট খাতা — সেই পুরনো ডায়েরি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না…”
ধীরে ধীরে তার চোখ বুজে গেল, মুখে মৃদু হাসি।
সে যেন ঘুমিয়ে পড়ল চেষ্টার স্বপ্নে।
তার মৃত্যুর পর হাজার হাজার মানুষ কাঁদল।
দেশের প্রত্যেকটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে “এক মিনিট নীরবতা” পালন হলো।
“চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়”-এর প্রতিটি ছাত্র তার নামে গাছ লাগাল।
তার কবরের পাশে লেখা হলো—
“এ মানুষটি শিখিয়েছিলেন—
হেরে যাওয়া নয়, থেমে যাওয়া আসল হার।”
বছর কেটে যায়, নতুন প্রজন্ম বড় হয়।
“চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়”-এর প্রতিটি শিক্ষার্থী আজ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে।
কেউ বিজ্ঞানী, কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী।
তারা যখনই কোনো সাফল্য অর্জন করে,
তখন একটা কথা লিখে রাখে—
“চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না,
সেখানেই অসম্ভবও সরে দাঁড়ায়।”
এক সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক উৎসবে
শাওন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল—
“রাকিব স্যার বেঁচে আছেন আমাদের ভেতর।
তার শেখানো তিনটি কথা মনে রেখো—
১️⃣ ভয় পেয়ো না
২️⃣ হাল ছাড়ো না
৩️⃣ চেষ্টা থামিও না”
হলভর্তি মানুষ একসাথে বলল—
“চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না, সেখানেই জীবন জয়ী হয়।”
রাকিব চলে গেছে, কিন্তু তার চেতনা বেঁচে আছে।
যখনই কোনো তরুণ অন্ধকারে ডুবে যায়,
তার গল্প তাকে আলোয় ফিরিয়ে আনে।
একটি গ্রামের ছেলের হাতে শুরু হওয়া সেই ছোট ফাউন্ডেশন
আজ কোটি মানুষের জীবনের দিশারি।
আর তার জীবনের সত্য একটাই—
চেষ্টা যেখানে থেমে যায় না,
সেখানেই মানুষ ঈশ্বরের দেওয়া শক্তির আসল রূপ খুঁজে পায়।